অর্থোপেডিক ডাক্তার হতে চাইলে

মানবদেহের অস্থি বা হাড়, অস্থিসন্ধি, লিগামেন্ট এবং মাংসপেশি সম্পর্কিত রোগ নির্ণয়, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা দেওয়ার কাজটি করেন একজন অর্থোপেডিস্ট। সহজ ভাষায়, মানুষের নড়াচড়ার সাথে সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার বিষয়টি দেখেন অর্থোপেডিস্ট। বিভিন্ন রোগের কারণে অস্থি বা অস্থিসন্ধির সমস্যা দেখা দিতে পারে। আবার দুর্ঘটনায় আহত রোগীর হাড় ভেঙে যাওয়াসহ নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। বয়সের কারণেও হাড়ে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়।

সরকারি বেসরকারি বড় হাসপাতালগুলোয় অর্থোপেডিকস সংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতায় চিকিৎসা দেওয়া হয়। এছাড়া বিশেষায়িত হাসপাতাল হিসেবে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালের কথা বলা যায়। সাধারণভাবে এটি পঙ্গু হাসপাতাল নামেই বেশি পরিচিত। অর্থোপেডিকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে আপনিও মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় ভূমিকা রাখতে পারেন এবং গড়তে পারেন সম্মানজনক ক্যারিয়ার। চিকিৎসা সেবায় পেশা গড়া অন্য যেকোনো পেশার চেয়ে অনেক বেশি সম্মানজনক। কারণ এই পেশার সাথে জড়িত রয়েছে মানবতাবোধ ও সহমর্মিতা।

কাজের ধরন                  

বাত, ব্যাক পেইন, হাড় এবং নরম টিস্যু টিউমার, হাড় ভাঙ্গা, হাড়ের টিউমার, কেভাস ফুট, আইউবি ফুট, ডেভেলপমেন্ট ডিসপ্লেসিয়া অব ডি হিপ (ডিডিএইচ), ডাওফ্রিজম এন্ড বোন ডাইপ্লাসিস, ফ্লাটফুট, ফ্র্যাকচারস, হিপ ভাঙ্গা,  হিপ সংক্রমন, কোলকুঁজে অবস্থা, লেগ-ফ্লেইভ-পারথেছ ডিজিস, লর্ডোসিস, এমসিএল ইনজুরিজ, স্কোলিওসিস, স্লিপড ক্যাপিটাল ফিমোর্যল ইপিফিসিস (এস সি এফ ই), স্পাইনাল টিউমার,স্পনডিলোলাইসিস, স্পনডিলোলিসথেসিস, স্পোর্টস ইনজুরিস, টারসাল কোয়ালিশন, বিচ্ছিন্ন লিগামেন্ট ইত্যাদি রোগের চিকিৎসা করে থাকেন। এছাড়াও ড্রেসিং করা বা করানো, প্লাস্টার করা, অস্থি সংক্রান্ত সার্জারি সম্পন্ন করাও একজন অর্থোপেডিক ডাক্তারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

দক্ষতা ও
যোগ্যতা

১. দক্ষ ও পারদর্শী

একজন অর্থোপেডিস্টকে অবশ্যই তাদের কাজ সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান থাকতে হবে। একজন চিকিৎসক প্রদত্ত চিকিৎসার উপর নির্ভর করে রোগীর সুস্বাস্থ্য। এজন্য তাকে সকল ছোটখাটো বিষয়ে খেয়াল রাখতে হয়। কারণ, সামান্য ভুল হলে একজন রোগীর পুরো চিকিৎসাতেই ভুল হবে, এমনকি রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তাই সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় এবং রোগীদের সঠিক চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করার দক্ষতা থাকতে হবে। রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ব্যবহারে পারদর্শী হতে হবে।

একজন অর্থোপেডিক ডাক্তার, Image Source: findatopdoc.com

এছাড়াও কৃত্রিম অঙ্গ, বায়োনিক অঙ্গ ও রোগীর পুনর্বাসন সম্পর্কিত জ্ঞান এবং সেইসাথে এন্টিবায়োটিক ও ড্রেসিং সম্পর্কে ভালো জ্ঞান থাকতে হবে। নতুন নতুন অস্ত্রোপচার পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। এছাড়াও নিজের শিক্ষাগত ধারণা আরো বাড়তে চাইলে বিভিন্ন অর্থোপেডিক কনফারেন্স ও সেমিনারগুলোতে  অংশগ্রহণ করতে পারেন, যা পরবর্তীতে আপনার ক্যারিয়ার উন্নয়নে সাহায্য করবে।

২. পরিশ্রমী

অত্যন্ত মনোযোগ
সহকারে কাজ করার মন মানসিকতা থাকতে হবে। লম্বা সময় ধরে অস্ত্রোপচার করার ধৈর্য
থাকতে হবে। এছাড়াও একজন চিকিৎসকের কাজের দায়িত্ব অনেক বেশি। একটানা অনেক সময়
কাজ করার মন মানসিকতা থাকতে হবে। দিন রাত যেকোনো সময় ডিউটি থাকতে পারে আবার অনেক
সময় ছুটির দিনেও ডিউটি থাকতে পারে।

৩. সাহসী

যেকোনো জটিল পরিস্থিতি মোকাবেলা করার মন মানসিকতা থাকতে হবে এবং চিন্তা ও বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে। এছাড়াও চিকিৎসার সময় রোগীর স্বাস্থ্যগত অগ্রগতির তথ্য সংরক্ষণ করে রাখাও একজন অর্থোপেডিক ডাক্তারের কাজের মধ্যে পড়ে।

শিক্ষাগত
যোগ্যতা

৫ বছর এমবিবিএস পড়াশোনা শেষ করার পর ১ বছর ইন্টার্নশিপ করতে হবে। সাধারণত এমবিবিএস ডিগ্রি পাস করলেই আপনি অর্থোপেডিক ডাক্তার হিসেবে কাজ করতে পারবেন। তবে অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ হতে এমবিবিএস ও ইন্টার্নশিপের পর চাইলে, এ বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিতে হবে। এক্ষেত্রে এফসিপিএস, এমএস, এফআরসিএস অথবা ডি-অর্থো ডিগ্রি নিতে পারেন। আপনি চাইলে একটি বা একের অধিক ডিগ্রি নিতে পারেন।

কাজের ক্ষেত্র

বাংলাদেশের প্রায় সকল সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতালে আলাদা অর্থোপেডিক বিভাগ আছে। সরকারি হাসপাতালে প্রভাষক হিসেবে যোগদানের পর অর্থোপেডিকে উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণ করে মেডিকেল কলেজের অর্থোপেডিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হওয়া যায়। সহকারী অধ্যাপক হিসেবে অন্তত পাঁচ বা ছয় বছর দায়িত্ব পালন করার পর যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে সহযোগী অধ্যাপক সম্ভব। আবারো কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও চাকরির অভিজ্ঞতা অর্জন করে সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক হওয়া যায়। তবে এক্ষেত্রে একের অধিক রিসার্চ পেপার থাকা বাধ্যতামূলক।

একজন চিকিৎসকের কাজের দায়িত্ব অনেক বেশি, Image Source: kimsdubai.com

বেসরকারি হাসপাতালে একজন অর্থোপেডিক ডাক্তারের ক্যারিয়ারের পদবিন্যাস সাধারণ জুনিয়র মেডিকেল সার্জন, সিনিয়র মেডিকেল সার্জন, রেজিস্টার, অর্থোপেডিক কনসালট্যান্ট,অধ্যাপক (অর্থোপেডিক)। সাধারণত অভিজ্ঞতা নেই এমন চিকিৎসকদেরকেই জুনিয়র মেডিকেল সার্জন হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তারপর পরবর্তী যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও নতুন কোনো ডিগ্রি অর্জনের উপর ভিত্তি করে জুনিয়র মেডিকেল সার্জন থেকে সিনিয়র মেডিকেল সার্জন, রেজিস্টার, অর্থোপেডিক কনসালট্যান্ট,অধ্যাপক (অর্থোপেডিক) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।

আয় রোজগার

সরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী বেতন দেয়া হয়। সেইসাথে রয়েছে বোনাস ও ভাতার সুবিধা। বেসরকারি খাতে অর্থোপেডিক ডাক্তারের মাসিক বেতনের পরিমাণ বাংলাদেশে বেশ ভালো। সাধারণত একজন ফ্রেশার হিসেবে নিয়োগ পেলে আপনার মাসিক বেতন হবে ২০,০০০ টাকা থেকে ৭০,০০০ টাকার মতো। অভিজ্ঞতাসম্পন্ন চিকিৎসকদের মাসিক বেতন শুরু হয় এক লাখ টাকা থেকে।

সময় ও অভিজ্ঞতার সাথে আপনার মাসিক আয় বেড়ে পাঁচ লাখ টাকা কিংবা তার অধিকও হতে পারে। কনসালট্যান্ট পদে নিযুক্ত ব্যক্তিদের সাধারণত মাসিক দেড় থেকে দুই লাখ টাকা বেতন দেওয়া হয়ে থাকে। অভিজ্ঞতা বাড়ার সাথে সাথে আয়ের পরিমাণও বাড়তে থাকবে। এর বাইরে স্বাধীনভাবে চেম্বার করার সুযোগ তো থাকছেই।

Featured Image: drbillhefley.com

The post অর্থোপেডিক ডাক্তার হতে চাইলে appeared first on Youth Carnival.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *