উদ্যোক্তার অধিক ইতিবাচক মনোভাব ঘটাতে পারে ব্যবসায় পতন

যারা নতুন ব্যবসা শুরু করার কথা ভাবছেন অথবা শুরু করেছেন, তাদের জন্য সাধারণ ও সবচেয়ে প্রচলিত পরামর্শ হলো ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলা। কিন্তু দেখা যায় যে, প্রায় অর্ধেকের মতো নতুন ব্যবসা শুরুর প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যে গুটিয়ে যায়, যার কারণ হিসেবে প্রয়োজনের অধিক আশাবাদী ও ইতিবাচক মনোভাবকে চিহ্নিত করা হয়। আমেরিকার শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রায় ৫০ শতাংশের মতো ক্ষুদ্র নতুন ব্যবসা শুরুর প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যে গুটিয়ে যায়। শুরুর প্রথম বছরে টিকে থাকে ৮০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় বছরে টিকে থাকে ৭০ শতাংশ ব্যবসা। দশ বছর পরে এই হার কমে দাঁড়ায় প্রায় ৩০ শতাংশের মতো।  

source:google.com

উদ্যোক্তার ইতিবাচক মনোভাব ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ন। সাধারণভাবে বলা যায়, যেকোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কার্যপ্রণালী সঠিক ও সুষমভাবে পরিচালনায় উদ্যোক্তার আশাবাদী ও ইতিবাচক মনোভাব সহায়ক হিসেবে কাজ করে। কিন্তু নতুন এক গবেষণায় দেখা যায় যে, প্রয়োজনের অধিক ইতিবাচকতা ব্যবসার প্রগতির পথে বাঁধা সৃষ্টি করে। গবেষণায় আরো বলা হয়,  যেসব উদ্যোক্তা অধিক ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন,  তাদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম ইতিবাচক মনোভাব পোষণকারী এবং বাস্তববাদী  উদ্যোক্তারা প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি আয় করেন।

উক্ত গবেষণা পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন যুক্তরাজ্যের বাথ বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স এন্ড পলিটিক্যাল সাইন্স এবং কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা, যা পরবর্তিতে ইউরোপিয়ান ইকোনমিক রিভিউ নামক একটি জার্নালে প্রকাশিত হয়। উক্ত গবেষণায় যুক্তরাজ্যের সেসব ব্যক্তিদের সম্পদ ও আয় পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে, যারা কর্মরত থাকা অবস্থায় নিজের নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন। এই পর্যবেক্ষণ এবং উপাত্ত সংগ্রহের কাজ চলে ১৮ বছর। গবেষণা শেষে গবেষকরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, অধিক আশাবাদী এবং ইতিবাচক মনোভাব পোষণকারী উদ্যোক্তারা তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠায় অসফল হন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, অধিক আশাবাদী উদ্যোক্তারা ব্যবসার সপকম্ভাব্য ঝুঁকি এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কথা না ভেবেই তাদের সর্বস্ব বিনিয়োগ করেন, যা পরবর্তিতে তাদের ব্যবসার সফলতার পথে বিপত্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

source: inc.com

এই গবেষণার অন্যতম গবেষক এবং বাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ক্রিস ডওসন বলেন, তাদের গবেষণা অনুযায়ী অনেক মানুষ ব্যবসার দিকে ঝুঁকে পড়ছে অধিক আয়ের আশায়। সামাজিকভাবে ইতিবাচক মনোভাব এবং উদ্যোক্তা তৈরিতে উৎসাহ দেয়া হলেও বাস্তবে ব্যবসার ক্ষেত্রে তা সবসময় আশানুরূপ সাফল্য অর্জনে সক্ষম হয় না।

অধ্যাপক ডওসন মনে করেন, নেতিবাচক মনোভাব খুব কাঙ্ক্ষিত কোনো বৈশিষ্ট্য না হলেও তা উদ্যোক্তাদের অযৌক্তিক ও ঝুঁকিপূর্ন বিনিয়োগ থেকে বিরত রাখে। অতীতে কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালনা করা হয় যেখানে দেখা যায়, নেতিবাচক মনোভাব মাঝে মাঝে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহনে ভুমিকা পালন করে।

লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সের ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ডেভিড ডী মেজা মনে করেন, সরকার প্রায়শই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উদ্যোক্তাদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে। কিন্তু সব ব্যবসা যে সব সময় সফল হবে, তা নয়। অসফল ব্যবসা উদ্যোক্তার সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে যে ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে তা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু অধিক আশাবাদী ও ইতিবাচক মনোভাব পোষণকারী উদ্যোক্তা ব্যবসায় সাম্ভাব্য ঝুঁকিসমূহের ওপর গুরুত্বারোপ না করে বিনিয়োগ করেন, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যবসার পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি আরো বলেন, যারা নীতি নির্ধারক আছেন তাদের এ ধরনের উদ্যোক্তা এবং নতুন ব্যবসাকে নিরুৎসাহিত করা উচিত।

source: gettyimages.co.uk

সোশ্যাল এন্ড পারসোনালিটি  সাইকোলজি কম্পাস নামক একটি সাময়িক পত্রিকায় “দ্যা সারপ্রাইজিং আপসাইডস অফ ওয়ারি” নামক একটি অনুচ্ছেদ প্রকাশিত হয়। উক্ত অনুচ্ছেদে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কেট সুইনি বলেন, “যদিও উদ্বিগ্নতা এবং নেতিবাচক মনোভাব কাঙ্ক্ষিত কোনো বৈশিষ্ট্য নয়, তবুও সব ধরনের উদ্বিগ্নতাই যে ক্ষতিকর, তা নয়। কিছু উদ্বিগ্নতা প্রেরণা যোগায়”।

source: theoracles.com

যেকোনো নতুন ব্যবসার প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে এমন কিছু পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় যখন অনাকাঙ্ক্ষিত লোকসান ঠেকানোর সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। কেট সুইনি আরো বলেন, “যখন কোনো দুঃসংবাদ আসে অথবা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্নতা তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্ত গ্রহনে সাহায্য করে”।

কানাডার ওয়াটার লু বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ জন শিক্ষার্থী ব্রেইন সাইন্স নামক একটি সাময়িক পত্রিকায় তাদের একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। উক্ত গবেষনায় তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, উদ্বিগ্নতা অনুচিন্তন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। নির্দিষ্ট মাত্রার উদ্বিগ্নতা মানুষকে অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনাসমূহ স্মরণ করতে সাহায্য করে।

source: ectorstock.com

সাধারণত উদ্যোক্তাদের আত্মবিশ্বাসী হতে হয় যে কোনো ধরণের কঠিন পরিস্থিতি সামলে ওঠার জন্য। একই সময়ে একজন উদ্যোক্তার ভিতরে এই ধরণের কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ার ভীতি কাজ করলে, উদ্যোক্তা, ব্যবসা এবং ব্যবসার সাথে জড়িত সকলের জন্য মঙ্গলজনক। ব্যবসায় অসফল হওয়ার ভয় উদ্যোক্তাকে তার লক্ষ্যের ব্যাপারে আরো মনোযোগী করে তোলে এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত গ্রহনে সাহায্য করে।

Featured image: http://knowstartup.com

The post উদ্যোক্তার অধিক ইতিবাচক মনোভাব ঘটাতে পারে ব্যবসায় পতন appeared first on Youth Carnival.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *