কীভাবে বুঝবেন আপনি অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার?

হঠাৎ পরিবারের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে, কারো হাত ভেঙে গেলে, বা শরীরে কোনো ক্ষত সৃষ্টি হলে সবাই তা দেখতে পায় এবং সেবা দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু মনের ক্ষত, তা কি খালি চোখে দেখা যায়?

Source: Huffington Post

সিংহভাগ পরিবারে নানা রকম পারিবারিক অশান্তি লেগেই থাকে। আর এই সমস্যাগুলোর ৯৯ শতাংশ অর্থনৈতিক বৈষম্য সম্পর্কিত। অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমে পারিবারিক সহিংসতা রোধের প্রচার অভিযান সম্পর্কিত সংস্থা অলস্টেট ফাউন্ডেশন পার্পেল পার্স পরিচালিত এক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

টেনিস তারকা এবং নারী অধিকার বিষয়ক আইনজীবী সেরেনা উইলিয়ামস বিষয়টি নিয়ে আরও গভীরভাবে কাজ করার জন্য ব্যক্তিগত মিশনে নেমেছেন। সেরেনা উইলিয়ামস বলেন, শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি চারজন নারীর একজন জীবদ্দশায় কখনো না কখনো পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয় এবং অবশ্যই সেখানে অর্থনৈতিক বৈষম্য থাকে। আমি এই পরিসংখ্যান দেখে রীতিমত ভয় পেয়ে গেছি। কেননা এই চারজন নারীর কোনো একজন আমার বন্ধু, পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী বা আপন কেউ হতে পারে।

অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হওয়া হয়তো পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা প্রচেষ্টা চালালে হয়তো এই সংখ্যা কমিয়ে আনতে পারবো।

অর্থনৈতিক অবমাননা বা বৈষম্য কী?

উইলিয়ামস বলেন, পারিবারিক সহিংসতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো অর্থনৈতিক অবমাননা বা বৈষম্য। এই বৈষম্য বা অবমাননা আরও নানান মাধ্যমে হতে পারে। সম্পর্ক ভেদে অবমাননার ধরন ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে পরিবারের মধ্যে কাউকে দমিয়ে রাখা এবং অর্থনৈতিকভাবে স্পষ্ট বৈষম্য সৃষ্টি করাকে অর্থনৈতিক অবমাননা বলা হয়।

Source: Erickson Living

অবমাননাকারীরা অর্থনীতিকে সূক্ষ্ম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, যার ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি বিরক্ত এবং বিক্ষিপ্ত হওয়া স্বত্বেও ভয়ঙ্কর সম্পর্কের জালে আটকে থাকে। অবমাননাকারীরা ভিকটিমের অর্থ প্রাপ্তি নিয়ন্ত্রণ করে। এমনকি তার সম্পদ ভোগ দখল করে। কিন্তু পারিবারিক এবং ধর্মীয় নানা বিধিনিষেধ ও সম্পর্কের কারণে ক্ষতিগ্রস্তরা কিছুই বলতে পারে না।

জরিপ মতে প্রতি চারজন নারীর একজন এবং প্রতি ৭ জন পুরুষের একজন পারিবারিকভাবে সহিংসতা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হয়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা পারিবারিক শান্তি ও সমৃদ্ধির কথা চিন্তা করে সবকিছু মুখ বুজে সহ্য করে। যে কারণে এগুলো খুব কম আলোচনায় আসে। অলস্টার জরিপে আরও উঠে এসেছে, পারিবারিক সহিংসতা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হওয়া এই হতভাগাদের মাত্র ৪৪ শতাংশ সহিংসতা বা বৈষম্যের কথা তার বন্ধু বা নিকট আত্মীয়ের কাছে প্রকাশ করে।

আর্থিক অবমাননা বা বৈষম্যের প্রধান তিনটি চিহ্ন

আর্থিক অবমাননা বা বৈষম্য কোনো শারীরিক আঘাত নয়। সুতরাং অনেক ক্ষেত্রে এটা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বাংলাদেশের বাস্তবতায় ধর্মীয় এবং সামাজিক কারণে অর্থনৈতিক অবমাননা বা বৈষম্যকে আমরা তিরস্কার না করে বরং সামাজিক এবং পারিবারিক নিয়ম ভেবে আলিঙ্গন করি।

Source: Healthy Burnett

তাহলে এভাবে বুঝবেন আপনি অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার? অনুন্নত এবং স্বল্প শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সামাজিক ট্যাবু ভাঙতে জেনে নিন পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে কেমন আচরণ পেলে বুঝবেন আপনি অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার।

সীমিত অর্থ প্রদান অথবা খরচ নিয়ন্ত্রণ

অর্থনৈতিক অবমাননাকারীরা আপনার প্রাপ্য অধিকার লংঘন করে সীমিত অর্থ প্রদান করবে, অথবা আপনার খরচ নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে। যেহেতু নগদ অর্থ নিরাপদ থাকলে সব ধরনের অর্থনৈতিক জটিলতা এড়িয়ে চলা যায়। তাই অবমাননাকারীরা আপনার নগদ অর্থ প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করবে। এমনকি তারা আপনার ব্যাংক চেক বা ক্রেডিট কার্ডের পাসওয়ার্ড নিজের দখলে নিতে চাইবে।

Source: Stay at Home Mum

অবমাননাকারী আপনার সকল প্রকার লেনদেন এবং কেনাকাটা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে এবং নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে। অর্থনৈতিক অবমাননাকারী যদি আপনার পরিবারকর্তা হয়ে থাকে, তবে দৈনন্দিন কেনাকাটা এবং সন্তানদের পোশাক কেনার ব্যাপারেও আপনার স্বাধীনতা থাকবে না।

আসলে অবমাননাকারী আপনার সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক জীবন নিয়ন্ত্রণ করে বোঝাতে চায়, তার উপর নির্ভরশীল থাকা ছাড়া আপনি একা চলতে পারবেন না। এখানে মানুষের কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা কাজ করে। যতদিন পর্যন্ত আমাদের এই উপনিবেশিক মানসিকতার সমাপ্তি না ঘটবে ততদিন হয়তো এই অবমাননা থেকে মুক্তি মেলা ভার।

আপনার কর্মক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ

অর্থনৈতিক অবমাননার আরেকটি বড় চিহ্ন হলো অবমাননাকারী সঙ্গী বা আত্মীয় আপনার কর্মক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করবে। আপনাকে অর্থ উপার্জন থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করবে। আপনাকে চাকরি থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করবে। এমনকি নানা রকম আচরণ এবং কর্মকাণ্ড দিয়ে আপনাকে বিক্ষিপ্ত ও বিরক্ত করার চেষ্টা করবে।

Source: NeilRosenthal

অবমাননাকারী আপনাকে অসুবিধায় ফেলতে আপনার অপছন্দ বা আপত্তিকর মানুষকে আপনার গাড়ি ব্যবহারের অনুমতি দিবে। আপনার বাচ্চাদের আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে নেওয়ার চেষ্টা করবে। সবকিছু মিলিয়ে আপনাকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করবে।

আপনার ক্রেডিট স্কোর বা অর্থনৈতিক অবস্থা প্রভাবিত করা

অর্থনৈতিক অবমাননার সর্বশেষ যে দৃষ্টান্ত বলতে চলেছি তা অত্যন্ত কৌশলগত। অর্থনৈতিক অবমাননাকারী নানা উপায়ে আপনার ক্রেডিট স্কোর প্রভাবিত করার চেষ্টা করবে, বা আপনার অর্থনৈতিক অবস্থা ক্রমশ খারাপ করার চেষ্টা করবে। এই প্রক্রিয়ায় সে নানান কৌশল প্রয়োগ করবে।

যেমন: পারিবারিক বিভিন্ন বিষয়ে আপনার নামে থাকা বিল পরিশোধ করতে বিলম্ব করবে, অথবা পরিশোধ করবে না। আপনার সাথে তার সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে আপনার নামে ঋণ করবে বা অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারি সৃষ্টি করবে, যা স্পষ্টভাবে আপনার অর্থনৈতিক অবস্থা এবং ক্রেডিট স্কোর প্রভাবিত করবে।

Source: Kip Linger

সুতরাং উপরিউক্ত চিহ্নগুলো উপলব্ধি করলে বুঝবেন আপনি অর্থনৈতিক অবমাননা বা বৈষম্যের শিকার।

পারিবারিক সহিংসতার অংশ হিসেবে অর্থনৈতিক অবমাননা বা বৈষম্যের শিকার হলে তা সহ্য করা সত্যিই অনেক কঠিন। কেননা পরিবারের সদস্যরা আপনারই আপনজন।

এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। দ্রুত অর্থ সঞ্চয় করুন। ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্য আরো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। কৌশলে অবমাননাকারীকে নিজের অবস্থান এবং শক্তি জানান দিন। সম্ভব হলে পারিবারিক অবস্থা বুঝে অন্য বন্ধু বা পরিবারের সদস্যের সাথে আলোচনা করুন এবং বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিন। অবমাননাককরী ধৈর্যের মাত্রা ছাড়ালে প্রয়োজনে আইনের ব্যবস্থা নিন এবং নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করুন।

Feature Image: Stay at Home Mum

The post কীভাবে বুঝবেন আপনি অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার? appeared first on Youth Carnival.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *