প্রতিবন্ধিতা জয় করে লক্ষ মানুষের অনুপ্রেরণা হয়েছেন যারা

আমাদের চারপাশে এমন অনেক মানুষ আছে যারা নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে নানা অজুহাত দাঁড় করায়। নিজের ভাগ্যকে দোষ দেয় এবং দিন শেষে কর্মহীন থাকে।

Source: DigiKarma

অথচ এর বিপরীতে অনেক মানুষ আছে যারা সকল বাঁধা-বিপত্তি অতিক্রম করে বিজয় ছিনিয়ে আনে। নিজের সীমাবদ্ধতা মহাশক্তিতে রূপান্তরিত করে নিজের এবং পৃথিবীর পরিবর্তনের জন্য কাজ করে। নিজের সাফল্যের মধ্য দিয়ে লক্ষ কোটি মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। এরাই হলো সত্যিকারের নায়ক, নেতা। সকল বাঁধা-বিপত্তি ভেঙেচুরে শির উঁচু করে দাঁড়ায়।

আজ আপনাদের এমন কিছু মানুষের গল্প বলবো যারা প্রতিবন্ধী হয়েও সব বাঁধা-বিপত্তি অতিক্রম করে সফল হয়েছে। নিজের প্রতিবন্ধিতাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে অসংখ্য মানুষের চোখ খুলে দিয়েছেন।

ড. টেম্পেল গ্র্যান্ডিন (Dr. Temple Grandin)

ড. টেম্পেল গ্র্যান্ডিন একজন প্রাণী বিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং প্রভাবশালী অটিজম বিষয়ক বক্তা। শৈশবে অটিজমের সাথে যুদ্ধ করে বড় হওয়ার পর অটিজম বিষয়ক বক্তা হয়ে ওঠার নজির শুধু গ্র্যান্ডিনের ক্ষেত্রেই আছে। তিনি সাড়ে তিন বছর বয়স পর্যন্ত কথা বলতে শেখেননি। তারপর একজন থেরাপিস্টের সহায়তায় ধীরে ধীরে কথা বলতে শুরু করেন।

Source: University of Washington

পরবর্তীতে তিনি অটিজম বিষয়ক লেখক এবং বিখ্যাত বক্তা হয়ে ওঠেন। ড. গ্র্যান্ডিন বর্তমানে কলোরোডা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী বিজ্ঞানের অধ্যাপক। শুধু অটিজম নয়, তিনি প্রাণী আচরণের উপরও একজন বিখ্যাত লেখক এবং গবেষক। ২০১০ সালে টাইম ম্যাগাজিন তাকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ জন ব্যক্তির তালিকায় স্থান দেন। এমনকি তার জীবনীর উপর চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।

এমিলি ডিকিনসন (Emily Dickinson)

এমিলি ডিকিনসন সর্বকালের সেরা আমেরিকান কবি এবং লেখকদের মধ্যে অন্যতম। তিনি কবিতাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন এবং সাহিত্যের নতুন ধারা সৃষ্টি করেন। বিখ্যাত এই কবির মধ্যেও প্রতিবন্ধীতার ছাপ ছিল।

Source: Poetry Foundation

লেখক জুলি ব্রাউন ডিকিনসনের সুপরিচিত ‘কুইকি’ আচরণ এবং অটিজম বৈশিষ্ট্যের কথা স্বীকার করেন।

এন্থনি ইনি (Anthony Ianni)

এন্থনি ইনি আমেরিকার জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ বিজয়ী বাস্কেটবল খেলোয়ার। এন্থনি এনির যখন প্রথম পিডিডি-এনওএস (PDD-NOS) রোগ ধরা পড়ে তখন ডাক্তাররা তার বাবামাকে বলেছিল সে কখনোই বড় কিছু করতে পারবে না। এমনকি সে স্কুলে যেতে পারবে না, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারবে না। বলার অবকাশ রাখে না কোনো ভাবেই একজন ক্রীড়াবিদ হতে পারবে না।

Source: 9&10 News

কিন্তু এন্থনি ডাক্তারদের এই ভবিষ্যৎবাণী ভুল প্রমাণ করেছেন। বাস্কেটবল প্রিয় কোনো মানুষকে কোনোভাবেই খেলার বাইরে রাখা সম্ভব না। এন্থনি তার দুর্বলতাকে শক্তিতে পরিণত করে দেশের সেরা বাস্কেটবল খেলোয়াড় হয়ে উঠেছেন। ২০০০ সালে তিনি ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে নিজেকে প্রমাণ করেছেন।

বর্তমানে এন্থনি ইনি জনপ্রিয় একজন অনুপ্রেরণাদায়ী বক্তা। যিনি লক্ষ লক্ষ তরুণকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করছেন।

আলবার্ট আইনস্টাইন (Albert Einstein)

পৃথিবীতে জন্ম নেওয়া সর্বকালের সেরা কিছু মানুষের তালিকা তৈরি করা হলে আলবার্ট আইনস্টাইন নিশ্চয়ই এই তালিকায় প্রথম সারিতে থাকবেন। আমরা সবাই জানি আলবার্ট আইনস্টাইন থিওরি অফ রিলেটিভিটি তথা আপেক্ষিকতা তত্ত্বের জনক। তিনি E = MC2 সমীকরণের প্রবক্তা, যা পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত সমীকরণ। এমনকি তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত এবং প্রভাবশালী একজন বিজ্ঞানী।

Source: Simple Wikipedia

কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ যেটা জানে না তা হলো আলবার্ট আইনস্টাইনও অটিজমে আক্রান্ত ছিলেন। টেম্পেল গ্র্যান্ডিনের মতো তিনিও তিন বছর বয়স পর্যন্ত কথা বলতে পারতেন না। এমনকি তার আশপাশের শিশুরা যখন সম্পূর্ণ বাক্য ভালো হবে বলতে পারেন তখনও তিনি স্পষ্ট করে বলতে পারতেন না। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে তার কথা বলার শক্তি স্বাভাবিক হয়।

ডানি বোম্যান (Dani Bowman)

ড্যানি বোম্যান একজন লেখক, শিল্পী এবং মোটিভেশনাল স্পিকার। কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের জন্য অন্যরা যখন দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে তখন বোম্যান শৈশবেই নিজের কোম্পানি শুরু করেন। অত্যন্ত মেধাবী এনিমেশন এবং চিত্রশিল্পী ড্যানি বোম্যান মাত্র ১১ বছর বয়সে নিজের কোম্পানি ড্যানিমেশন ইন্টারটেইনমেন্ট শুরু করেন এবং তার তিন বছরের মধ্যেই পেশাদার এনিমেশন শিল্পী হিসেবে কাজ করা শুরু করেন।

Source: Daemen Voice – Daemen College

একজন উৎসাহী অটিজম এডভোকেট এবং অনুপ্রেরণাদায়ী বক্তা হিসেবে এইচডি এবং প্রতিবন্ধীতার কারণে যারা নিজের সঠিক মেধার প্রয়োগ করতে পারে না তাদের নিয়ে কাজ করেন। প্রতিবন্ধীদের সব সময় সক্রিয় রাখতে এবং লক্ষ্য পূরণের জন্য অনুপ্রাণিত করতে তার প্রচেষ্টার অন্ত থাকে না।

ডক্টর ভার্ণন স্মিথ (Dr. Vernon Smith)

সর্বশেষ এমন একজন মহান মানুষের উদাহরণ দিতে চাই, যিনি সত্যিকার অর্থে তার প্রতিবন্ধকতাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করেছেন। ডক্টর ভার্ণন স্মিথ একজন উদ্ভাবনী অর্থনীতির অগ্রগণ্য অর্থনীতিবিদ। অর্থনীতিতে তার অসামান্য অবদানের জন্য ২০০২ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

তার অ্যাসপারজার সিন্ড্রোম রোগ সম্বন্ধে তিনি খোলাখুলি বলেন। তার সব অর্জন এবং সাফল্য তার এই প্রতিবন্ধীতার জন্য সম্ভব হয়েছে।

Source: Blog Pong

তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, সামাজিকতা রক্ষার জন্য অন্যরা যেভাবে কাজ করে আমি সেভাবে কাজ করার ব্যাপারে কখনো চাপ অনুভব করি না। যে কারণে আমি অর্থনীতির আরও অনেক গভীর বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পাই।

পৃথিবীতে এমন অসংখ্য মানুষ আছে যারা নিজেদের দুর্বলতাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করেছেন এবং সাফল্যের সুউচ্চ শিখরে আরোহন করেছেন। সুতরাং আপনার মধ্যে যদি লক্ষ্য পূরণের তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকে তাহলে কোনো প্রতিবন্ধকতাই আপনাকে আটকাতে পারবে না। নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকলে সকল প্রতিবন্ধকতা জয় করে বিজয় মুকুট ছিনিয়ে আনা সম্ভব। সুতরাং হীনমন্যতা ত্যাগ করে আজই কাজে নেমে পড়ুন এবং নিজের স্বপ্ন পূরণ করুন।

Feature Image: Blog Pong

The post প্রতিবন্ধিতা জয় করে লক্ষ মানুষের অনুপ্রেরণা হয়েছেন যারা appeared first on Youth Carnival.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *