ফিনটেক যেভাবে ভবিষ্যৎ অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করবে

ফিনটেক তার শক্তিশালী প্রযুক্তি এবং আকর্ষণীয় ক্ষমতা দ্বারা ঐতিহ্যগত ব্যাংক ব্যবস্থা বা অর্থনৈতিক পরিষেবা পদ্ধতি আমূল পাল্টে দিয়েছে।

Source: Data Driven Investor

আগামী বছরগুলোতে আমরা এই খাতে এমন অসামান্য সব প্রবণতা এবং পরিবর্তন দেখতে চলেছি যা আমাদের অর্থব্যবস্থা এবং লেনদেন এক অনন্য পর্যায়ে নিয়ে যাবে।

ফিনটেক কী?

ফাইনান্সিয়াল টেকনোলজির সংক্ষিপ্ত রূপ ফিনটেক। ফিনটেক হলো সেই উদ্ভাবনী প্রযুক্তি যা প্রথাগত অর্থব্যবস্থা এবং আর্থিক পরিষেবা খাতকে উন্নত, জনবান্ধব এবং সহজীকরণ করার প্রক্রিয়ায় কাজ করছে। এটি সাম্প্রতিককালের এক উদীয়মান প্রযুক্তি যা অর্থনৈতিক উন্নতিতে প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করে। যেমন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের জন্য স্মার্ট ফোন ব্যবহারসহ অনলাইনে সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন বিল পরিশোধের সুবিধা ফিনটেকের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

Source: Andy Sowards

ফিনটেক কিভাবে আমাদের অর্থনৈতিক জীবন পাল্টে দিচ্ছে, তা বোঝার জন্য আজকের নিবন্ধে ফিনটেকের কিছু উদ্ভাবনী প্রবণতা নিয়ে আলোচনা করা হলো।

একচেটিয়া ডিজিটাল ব্যাংকিং

ফিনটেক শিল্পের ব্যাপক বিস্তৃতির ফলে ব্যাংকিং খাতে ব্যাপকভাবে ডিজিটাইজেশন হয়েছে। প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছেড়ে সাধারণ মানুষ প্রযুক্তির এই সুবিধা লুফে নিয়েছে। এমনকি ব্যাংকে লেনদেনের ব্যাপারে মানুষের মানসিকতা আমূল পাল্টে গেছে। মানুষ এখন আর ব্যাংক পরিদর্শন করতে চায় না। সশরীরে ব্যাংক পরিদর্শন করা, মানুষ অযথা সময়ের অপচয় বলে মনে করে। তারা সকল প্রকার ব্যাংকিং লেনদেন অনলাইনে সেরে ফেলতে চায়।

পিডব্লিউসি’র এক জরিপ মতে ৪৯ শতাংশ গ্রাহক সকল ব্যাংকিং লেনদেন নিজের ডেক্সটপ অথবা স্মার্ট ফোন থেকে সেরে ফেলতে চায়।

Source: Disti Info

কিছু মোবাইল ফোন প্রস্তুতকারী এবং সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির জরিপ আরো চোখ কপালে ওঠার মতো। তারা বলছে ২০১৭ সাল থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ব্যাংক পরিদর্শন করা গ্রাহকের সংখ্যা ৩৬ শতাংশ কমে আসবে এবং মোবাইল ফোনের সকল প্রকার লেনদেন ১২১ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে, অর্থাৎ সামনের দিনে ফিনটেক খাতের সর্বগ্রাসী সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে।

স্বয়ংক্রিয় ব্যবসায়ীক কার্যক্রম

অর্থনৈতিক প্রযুক্তির আবির্ভাবের পর খুব দ্রুত ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলে পাল্টে যাচ্ছে। ব্যবসায়িক লেনদেন, অর্থনীতির ধারণা এবং সমগ্র প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাচ্ছে। ফিনটেক কোম্পানিগুলো ব্যাংক পরিসেবা খাতের ঋণ, অর্থ প্রদান, বীমা, ক্রেডিট কার্ড সুবিধা ইত্যাদি সেবাগুলো স্বয়ংক্রিয় ফাংশনে রূপান্তরিত করছে।

বিশ্বব্যাপী প্রায় সব ব্যাংকসহ আর্থিক খাতের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসায় এই স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছে। যার ফলে প্রতিযোগীতায় টিকে থাকতে এবং গ্রাহককে আরও উন্নত সেবা দিতে আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের প্রয়োজনেই ফিনটেক কোম্পানিগুলো সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করছে।

Source: Forbes

পিডব্লিউসি’র জরিপ মতে বিশ্বব্যাপী ফিনটেক খাতে বিনিয়োগ ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে।

আর্থিক পরিষেবা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ফিনটেক কোম্পানির সাথে গ্রাহক এবং লভ্যাংশ ভাগাভাগির ভিত্তিতে একসাথে কাজ করছে। অর্থ পরিচালনা, ঋণদান, অর্থ গ্রহণ এবং প্রদানসহ সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া ফিনটেকের সহযোগিতায় ডিজিটাইজেশন হাওয়ায় আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর যেমন ব্যয় কমেছে এবং আয় বেড়েছে, একইভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সাথে পাওয়ায় ফিনটেক কোম্পানিগুলো খুব দ্রুত বিকশিত হচ্ছে।

এছাড়া ফিনটেক কোম্পানিগুলো বর্ধিত সুবিধা হিসেবে অনলাইনে তথ্য বিশ্লেষণ এবং গবেষণার মাধ্যমে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিপণন এবং গ্রাহক সেবা আরো উন্নত করার পরামর্শ দিয়ে থাকে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ডিজিটাল সহায়তা

ফিনটেক কোম্পানিগুলো ব্যাংক এবং আর্থিক খাতের লেনদেন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্ট তথা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রোবট দিয়ে পরিচালনার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রোবটগুলো কণ্ঠস্বর শুনে কাজ করতে পারবে, এমন প্রযুক্তি উন্নত করার প্রচেষ্টা চলছে। যেন ভবিষ্যতে ব্যাংকগুলোতে মানুষের পরিবর্তে রোবট ব্যবহার করা যায়।

Source: Chat Boten

যেমন সিঙ্গাপুরের ওসিবিসি ব্যাংক সম্প্রতি ভয়েস ব্যাংকিং চালু করার জন্য মার্কিন প্রতিষ্ঠান গুগলের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। রোবটের সাথে কথোপকথনে চ্যাটবোর্ড এখন তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছে এবং এই প্রযুক্তি আরো উন্নত করার প্রক্রিয়া চলছে।

এছাড়া সকল প্রকার ব্যাংক জালিয়াতি ও প্রতারণা বন্ধে ইতিমধ্যে ফিনটেক প্রযুক্তি তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। বিশ্বের প্রায় সব ব্যাংক এখন নিরাপত্তার জন্য ফিনটেক প্রযুক্তির নানা সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করছে।

অনলাইন লেনদেন

স্মার্টফোন বিপ্লব এবং ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা ব্যাংকিং, পেমেন্ট এবং অর্থ লেনদেন পদ্ধতি সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছে। গার্টনার নামে একটি সংস্থার জরিপ মতে ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেটে সংযুক্ত মোবাইল ডিভাইসের সংখ্যা ২০ দশমিক ৮ বিলিয়নে পৌঁছে যাবে। ফিনটেক কোম্পানিগুলি এমন একটি শক্তিশালী ইকোসিস্টেম তৈরি করবে, যা আইওটিকে ব্যাংকিং এবং অর্থ প্রদানের প্রয়োজনীয়তার সাথে সম্পৃক্ত করবে।

তথ্য নিরাপত্তা

ফিনটেক বিস্তৃতি লাভ করার সাথে সাথে তথ্য এবং অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তাই ডিজিটাইজেশন, নিরাপত্তা, এবং গোপনীয়তা ফিনটেক কোম্পানির জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে এখন পর্যন্ত যারা মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ব্যবহার করেনি তাদের ৫৭ শতাংশের কারণ হিসেবে নিরাপত্তার কথা উঠে এসেছে।

Source: Pymnts

সুতরাং সামনের দিনে তথ্য সুরক্ষা, গোপনীয়তা এবং নিরাপত্তার বিষয়টি ফিনটেক শিল্পের জন্য প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়াবে। তারা গ্রাহকের ব্যক্তিগত সনাক্তকরণ তথ্য অনেক সতর্কতার সাথে যাচাই-বাছাই করবে। আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা বিধান করাই তখন ফিনটেক কোম্পানিগুলোর গুরু দায়িত্ব হয়ে উঠবে। কেননা এই প্রযুক্তি তখন দুষ্কৃতিকারী এবং আর্থিক খাতের জালিয়াতরাও ব্যবহার করা শুরু করবে।

তবে ফিনটেক শিল্পের ব্যাপক সাফল্যের পর আর্থিক খাতে মানুষের কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কেননা তখন মানুষের জায়গা দখল করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন রোবট এবং উন্নত প্রযুক্তি। আর্থিক লেনদেন যত সহজ হবে, হয়তো অর্থের প্রয়োজনীয়তাও তত কমতে শুরু করবে। তবে যাই হোক ফিনটেক প্রযুক্তি সামনের দিনে বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করবে।

Feature Image: Andy Sowards

The post ফিনটেক যেভাবে ভবিষ্যৎ অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করবে appeared first on Youth Carnival.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *