যে ৭টি কারণে উচ্চশিক্ষার জন্য ডেনমার্ককে বেছে নিতে পারেন

ডেনমার্ক  উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের একটি রাষ্ট্র। ভাইকিংয়েরা ১,১০০ বছর আগে ডেনীয় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। এটি ইউরোপের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রাজত্বগুলির একটি। কোপেনহেগেন ডেনমার্কের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। বর্তমানে ডেনমার্ক জুটলান্ড উপদ্বীপের অধিকাংশ এলাকার উপর অবস্থতি একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র। এছাড়াও স্কটল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমে ১৮টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত ফারো দ্বীপপুঞ্জ এবং তারও অনেক উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অধীন।

উত্তরে অবস্থিত হলেও উষ্ণ উত্তর আটলান্টিক সমুদ্র স্রোতের কারণে ডেনমার্কের জলবায়ু তুলনামূলকভাবে বেশ মৃদু। এখানে রয়েছে ঢেউ খেলানো পাহাড়ের সারি, সাজানো গোছানো খামার, এবং বিস্তৃত গ্রামীণ সবুজ চারণভূমি। ডেনমার্কের কোনো অংশ থেকেই সাগরের দূরত্ব ৬৪ কি.মি. বেশি নয়, ফলে সমগ্র দেশেই উপকূলীয় আবহাওয়া বিরাজমান। তাই ডেনমার্কের আকাশ সবসময় কুয়াশা ও মেঘাচ্ছন্ন থাকে।

ডেনীয়রা তাদের সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদের সদ্ব্যবহারে চাতুর্য ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। এটি ইউরোপের সবচেয়ে প্রাচীন ও সমাজকল্যাণমূলক রাষ্ট্রগুলোর একটি। এছাড়াও ফ্যাশন, শিল্পকারখানার ডিজাইন, চলচ্চিত্র ও সাহিত্য ডেনীয়রা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

Image Source: thelocal.dk

ডেনমার্ক ধনী, সুখী ও অত্যন্ত আধুনিক একটি দেশ। এবং এখানের জীবন যাত্রার মান উন্নত। এছাড়াও বন্ধুভাবাপন্ন ও সহযোগী মনমানসিকতাসম্পন্ন এখানকার মানুষ। তাই  ইউরোপের অন্যান্য দেশের পাশাপাশি বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে উঠে এসেছে ডেনমার্কের নাম।

অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কোঅপারেশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শিক্ষার জন্য সবচেয়ে বেশি অর্থ খরচ করে থাকে ডেনমার্ক। ওইসিডি তার ৩৫টি সদস্য দেশ ও অন্য আরো কিছু দেশের ওপর পরিচালিত সমীক্ষা থেকে প্রকাশ করেছে যে এ তালিকায় বিশ্বে ডেনমার্কের অবস্থান ২য়।

ডেনমার্কের সেরা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় হলো

আইটি ইউনিভার্সিটি অব কোপেনহেগেন, কোপেনহেগেন বিজনেস স্কুল,আরহাস ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব কোপেনহেগেন, ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ডেনমার্ক, টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব ডেনমার্ক, আলবর্গ ইউনিভার্সিটি, রসক্লাইড ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি কলেজ অব নর্দার্ন ডেনমার্ক, ইউনিভার্সিটি কলেজ ইউসিসি, ইউনিভার্সিটি কলেজ লিলেবায়েল্ট, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি কলেজ,  ইউনিভার্সিটি কলেজ এবসালন, ইউনিভার্সিটি কলেজ সাউথ ডেনমার্ক, ভিআইএ ইউনিভার্সিটি কলেজ, আরহাস স্কুল অব মেরিটাইম এন্ড টেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, কোপেনহেগেন স্কুল অব মেরিটাইম এডুকেশন এন্ড ট্রেনিং, ড্যানিশ স্কুল অব মিডিয়া এন্ড জার্নালিজম ইত্যাদি।

যেসব বিষয় পড়ানো হয়

৬০০ বেশি বিষয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ রয়েছে ডেনমার্কে। তবে ডেনিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত আইটি, বিজনেস ও প্রকৌশল কোর্সের জন্যে বেশি জনপ্রিয়।

অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি এখানে করা যাবে পিএইচডিও। ডেনমার্কে যেসব বিষয়ে ডিগ্রি নেয়া যাবে সেগুলো হলো- ইলেক্ট্রনিকস এন্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং,ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার সায়েন্স,আর্কিটেকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং, কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, অটোমেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, ডিজিটাল মিডিয়া ইঞ্জিনিয়ারিং, আইসিটি ইঞ্জিনিয়ারিং,আর্কিটেকচার, এস্ট্রোনমি, বায়োকেমিস্ট্রি, বায়োটেকনোলজি, এপ্লায়েড ম্যাথমেটিকস, ইনফরমেশন এন্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজিস, রোবোটিকস, একাউন্টিং এন্ড ফিন্যান্স, ফ্যাশন এন্ড টেক্সটাইলস ডিজাইন, ফিল্ম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ ইত্যাদি।

১। উন্নতমানের শিক্ষা ব্যবস্থা

এখানকার শিক্ষা এবং ডিগ্রির মান উন্নত বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। ২০১২-২০১৩ সালের কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাঙ্কিং অনুযায়ী, পূর্ব ইউরোপের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে ডেনমার্কের কোপেনহেগেন ইউনিভার্সিটি। উত্তর ইউরোপের সেরা ও সবচেয়ে প্রাচীন এ বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠা ১৪৭৯ সালে। এখন পর্যন্ত এ বিশ্ববিদ্যালয়টি পদার্থ ও মেডিসিন বিভাগে ৮টি নোবেল পুরস্কার লাভের অসামান্য গৌরব অর্জন। এছাড়াও ডেনমার্কের আরো বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ব র‍্যাঙ্কিং অনেক এগিয়ে আছে।

Image Source: studyindenmark.dk

ডেনমার্কে কোর্সভেদে সর্বনিম্ন আইইএলটিএস স্কোর ৫.০ দিয়েও আবেদন করা যায়। একাডেমিক পরীক্ষায় কমপক্ষে পঞ্চাশ শতাংশ নম্বর থাকলে ভালো। ভর্তি এবং শিক্ষা বৃত্তি সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট থেকে জানা যাবে।

২। শিক্ষাবৃত্তির সুযোগ

আইইএলটিএস, জিম্যাট বা জিআরই স্কোর এবং একাডেমিক গ্রেড ভালো থাকলে, ডেনিশ সরকারের শিক্ষাবৃত্তির জন্য আবেদন করতে পারবেন। এক্ষেত্রে শিক্ষাবৃত্তির পাওয়ার সম্ভাবনা অস্ট্রেলিয়া, কানাডা কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক বেশি।

৩। আবাসন ব্যবস্থা

ডেনামার্কে পড়াশোনা জন্য যেতে চাইলে, আপনাকে আবাসন নিয়ে তেমন একটা মাথা ঘামাতে হবে না। কারণ অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই আবাসন সুবিধা দেয়া হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী সেই সুবিধা গ্রহণ করতে হবে। আর তা না হলে নিজ উদ্যোগে আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

৪। কাজের সুযোগ

এখানে শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা করার পাশাপাশি খন্ডকালীন কাজের সুযোগ রয়েছে। ছাত্র ছাত্রীদের ডেনমার্কে সপ্তাহে ২০ ঘন্টা কাজের সুযোগ রয়েছে। এছাড়াও বন্ধের সময় ফুল টাইম কাজ করতে পারবে।

৫। স্থায়ী বসবাসের সুযোগ

ডেনমার্কে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুবিধা রয়েছে। তবে এজন্য একটানা বৈধভাবে আট বছর থাকতে হবে। এই আট বছরের মধ্যে ৩-৪ বছরের পূর্ণকালীন চাকরির অভিজ্ঞতা ও প্রমাণপত্র থাকতে হবে। তাহলেই আপনি সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যে আবেদন করতে পারবেন।

Image Source: worldatlas.com

এছাড়াও ডেনিশ মাস্টার্স বা পিএইচডি কোর্স শেষ করার পর আপনি এক ধরনের ভিসা পেতে পারেন। এ ভিসাকে বলা হয় ‘স্টাব্লিশমেন্ট ভিসা’ । এই ভিসা ব্যবহার করেও সেখানে দুই বছর পূর্ণকালীন চাকরির বা নিজে ব্যবসা করতে পারবেন।

৬। সুখী দেশ

জাতিসংঘের ২০১৮ সালের ‘ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট’ অনুযায়ী বিশ্বের  সুখী দেশের তালিকায় ডেনমার্কের অবস্থান তৃতীয়।

কল্যাণ, আয়, স্বাধীনতা, আস্থা, আয়ু, সামাজিক সহায়তা ও বদান্যতা এই ছয়টি উপাদানের ভিত্তিতে একটি দেশ বা জাতির ‘সুখ’ বিচার করা হয়।  দুর্নীতি ও অপরাধের হার সীমিত থাকার কারণে ডেনমার্ককে বিশ্বের অন্যতম সুখী দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়াও এখানের সব নাগরিককে বিনামূল্যে বা অত্যন্ত স্বল্পমূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, সরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা, পরিবহণ অবকাঠামোগত ব্যবহারের সুবিধাসহ আরো অনেক ধরনের সামাজিক সুবিধা দেয়া হয়ে থাকে।

৭। বৈচিত্র্যময় খাদ্য সংস্কৃতি

ডেনমার্কে অধ্যয়ন করার আরেকটি কারণ এদেশের অনন্য খাদ্য সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা। ছোট দেশ হলেও খাবার-দাবারের বৈচিত্র্যের নিরিখে ডেনমার্ক কোনো অংশে কম নয়৷ বিদেশের অনেক খাবারও নতুন রূপে দেখা যায় ডেনমার্কে।

ডেনমার্কের সকালের নাস্তার জনপ্রিয় একটি খাবার হলো “জানক্রেট ক্রাম্বেল”, যা “রায় ব্রেড” (গম জাতীয় শস্যদানা থেকে তৈরি পাউরুটি) যা বাদামি চিনি সাথে মিশিয়ে খাওয়া হয়ে থাকে।

Image Source: enwikipedia.com

ডেনমার্কের ঐতিহ্যবাহী খাবারের মধ্যে অন্যতম হলো- স্টেগ ফ্লিস্ক (ভাজা শুয়োরের মাংস), স্মোরব্রুড (একধরণের ড্যানিস স্যান্ডউইচ), রুগ ব্রুড (একধরণের বিশেষ রুটি), লেকরিডস (অ্যালকোহল মিশ্রিত এক ধরণের চকলেট) ইত্যাদি।

এছাড়াও ড্যানিস প্যাস্ট্রি সারা বিশ্বে খুবই জনপ্রিয়। প্যাস্ট্রি ছাড়াও এখানের অন্যান্য ডেজার্টগুলো খুবই সুস্বাদু।

Featured Image: study.eu

The post যে ৭টি কারণে উচ্চশিক্ষার জন্য ডেনমার্ককে বেছে নিতে পারেন appeared first on Youth Carnival.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *