স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিস্ট হতে চাইলে

যে সকল ব্যক্তি (শিশু বা বয়স্ক) তাদের গঠনগত অথবা উচ্চারণগত সমস্যার কারণে অন্যের সাথে কথা বলা অথবা ভাব বিনিময়ে বাঁধার সম্মুখীন হয়ে থাকে তাদের জন্য স্পিচ এ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি একটি বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা ব্যবস্থা। রোগীর সমস্যার ধরণ, কারণ ও রোগীর অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে একজন স্পিচ এ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিস্ট নির্ধারণ করেন তাকে কিভাবে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হবে।

একজন থেরাপিস্ট শুধুমাত্র রোগীর শারীরিক, মানসিক অবস্থাই নয় বরং তার সামাজিক অবস্থা পর্যালোচনা করে চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। রোগীকে তার পরিবার এবং সমাজের অন্য সবার সাথে যোগাযোগে সক্ষম করার জন্য সহায়ক সামগ্রীর ব্যবহার বা বিকল্প পদ্ধতির ব্যবহার ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কথাও বিবেচনা করেন স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিস্ট। আপনিও চাইলে এই মহৎ পেশায় নিজের ক্যারিয়ার গড়তে পারেন এবং মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় ভূমিকা রাখতে পারেন ।

যাদের জন্য স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি প্রয়োজন হয়,

শিশুদের ক্ষেত্রে                        

সেরিব্রাল পলসি, অটিজম, ডাউন সিনড্রোম, শ্রবণ প্রতিবন্ধী, এডিএইডি, ঠোট ও তালু কাটা, লিখন প্রতিবন্ধকতা, তোতলামি, খাবার চিবানো ও গিলতে সমস্যা, আর্টিকুলেশন অ্যান্ড ফোনোলোজিক্যাল ডিজঅর্ডার।

স্নায়ুরোগীদের ক্ষেত্রে

স্ট্রোক, ট্রমাটিক ব্রেইন ইনজুরি (মাথায়
আঘাতপ্রাপ্ত রোগী), আলজাইমার, ডিমেনসিয়া, গুলেনবারী সিনড্রোম, মোটর নিউরণ ডিজিজ।

মানসিক সমস্যা আক্রান্তদের ক্ষেত্রে

সিজোফ্রেনিয়া, পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার, আংজাইটি
ডিজর্ডার, বিষণ্ণতা, মাসকুলার ডিজট্রোফি, মেনিনজাইটিস ইত্যাদি।

কোথায় পড়বেন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিউনিকেশন ডিসঅর্ডার বিভাগে দুই বছরের প্রফেশনাল এমএসএস ইন স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি (পিএমএসএলটি) কোর্স রয়েছে। সাভারের সেন্টার ফর দ্যা রিহ্যাবিলিটেশন অফ দ্যা প্যারালাইসড (CRP) এর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ হেলথ প্রফেশন ইন্সটিটিউটে (BHPI) স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিতে ৫ বছর মেয়াদি বিএসসি ডিগ্রি রয়েছে, যার শেষ এক বছর বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ করতে হয়।

Image Source: torbayandsounddevon.nhs.uk

এছাড়াও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান প্রয়াস ইন্সটিটিউট অব স্পেশাল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ (PISER) রয়েছে। সেখান থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি (১ বছর ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক)  বিএসসি ইন অডিওলোজি অ্যান্ড স্পিচ ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি, ১ বছর মেয়াদি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা এবং ২ বছর মেয়াদি এমএসসি ইন অডিওলোজি অ্যান্ড স্পিচ ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি ডিগ্রি নিতে পারেন।

উচ্চশিক্ষার 
সুযোগ

বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অডিওলোজি এন্ড
স্পিচ ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিতে অনার্স, মাস্টার্স ও পিএইচডি পর্যায়ে পাঠদান ও গবেষণা
হয়। ফলে এই বিভাগ থেকে পাস করে ইংল্যান্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা,
অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, সুইডেনসহ
পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নেওয়া ও গবেষণা করা যায়।

যেসব বিষয় পড়ানো হয়

এ বিভাগের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রম অন্যান্য বিষয়ের চেয়ে একেবারে আলাদা।এই বিভাগে ভাষাবিজ্ঞান ও যোগাযোগ শাস্ত্রের বিভিন্ন মৌলিক বিষয় যেমন পড়ানো হয়, তেমনি এতে অন্তর্ভুক্ত আছে অ্যানাটমি ও ফিজিওলজিসহ স্নায়ুতত্ত্ব-বিষয়ক বিভিন্ন কোর্স। শিশু ও বয়স্কদের বিভিন্ন বাচন ও ভাষা বৈকল্য বিষয়ক কোর্স, যেমন: অটিজম, অ্যাফেজিয়া, পাঠ বৈকল্য, লিখন বৈকল্য, তোতলামি, শ্রবণ সমস্যা ইত্যাদি বিষয়ে পড়ার সুযোগও এখানে রয়েছে। এছাড়াও সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ, নিউরোলজি অব ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কমিউনিকেশন এবং পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈকল্য বা বিঘ্ন ঘটায়, এমন সব উপসর্গ ও সেগুলোর ব্যবহারিক চিকিৎসা পদ্ধতি ছাত্রছাত্রীদের পড়ানো হয়। স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি কেবল একটি তত্ত্বীয় বিষয় নয়, এখানে ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা গ্রহণেরও সুযোগ রয়েছে। 

কাজের সুযোগ

বাংলাদেশে চাহিদার তুলনায় স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট এর সংখ্যা অনেক কম। তবে এখন সচেতনতা বৃদ্ধির সাথে সাথে এ পেশার চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি হাসপাতালেও  স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্টের পদ রয়েছে। জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের অধীনে বর্তমানে দেশের ৬৪টি জেলা ও ৩৯টি উপজেলায় ১০৩টি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র চালু রয়েছে এর মধ্যে ৭৩ টি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে স্পিচ থেরাপি দেওয়া হয়। এসব প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রগুলোতে ও সরকারি  বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়গুলোতে স্পিচ থেরাপিস্ট নিয়োগ দেওয়া হয়।

Image Source: silent-sound.co.uk

সেইসাথে রয়েছে অসংখ্য বেসরকারি স্পেশাল চিলড্রেন স্কুল ও অটিজম কেয়ার সেন্টার, সেখানেও স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্টরা কাজের সুযোগ রয়েছে। বিভিন্ন এনজিও যেগুলো প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করে এবং বেসরকারিভাবে গড়ে ওঠা থেরাপি সেন্টারগুলোতে কাজের সুযোগ অনেক। স্পিচ থেরাপিস্ট হিসেবে সরকারের সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনে উচ্চপদে কাজের সুযোগ আছে। সেইসাথে নিজের চেম্বার খুলে কাজ করার সুযোগ তো থাকছেই।

এছাড়াও স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপির ডিগ্রি বাইরের দেশগুলোতে বেশ প্রচলিত। তাই এই বিভাগ থেকে পাস করে শিক্ষার্থীরা দেশের পাশাপাশি বিদেশেও স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিস্ট হিসেবে কাজ করতে পারবেন। স্কুল ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানেও স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিস্ট চিকিৎসক হিসেবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।

আয় রোজগার

স্পিচ থেরাপিস্ট হিসেবে মাসিক উপার্জন নির্ভর করে কর্মক্ষেত্রের উপর। সরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী বেতন দেয়া হয়। সেইসাথে রয়েছে বোনাস ও ভাতার সুবিধা। যোগ্যতা অনুযায়ী বেশ ভালো পরিমাণের বেতন পাওয়া সম্ভব। অভিজ্ঞতা থাকলে  মাসিক ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। অভিজ্ঞতা বাড়ার সাথে সাথে আয়ের পরিমাণও বাড়তে থাকবে

Featured Image: saga.com.uk

The post স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিস্ট হতে চাইলে appeared first on Youth Carnival.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *