যেভাবে আপনার ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বিনিয়োগকারীর সামনে পেশ করবেন

যেকোনো ব্যবসা শুরু করা ও তার প্রসারের জন্য চাই বিনিয়োগ। ছোটোখাটো ব্যবসার ক্ষেত্রে কেবল উদ্যোক্তা বা সহ-উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ যথেষ্ট হলেও বড় ধরনের ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রচুর মূলধনের প্রয়োজন হয়। এজন্য বাইরের তথা দেশি বা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার প্রয়োজন হতে পারে। এজন্য আপনাকে জানতে হবে বিনিয়োগকারীদের পছন্দ ও অপছন্দ এবং তাদের বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার নানা উপায়।

ছবিসূত্রঃ TechStarters

বর্তমানে টেলিভিশনের বিভিন্ন চ্যানেলে এমনকি বিভিন্ন সংস্থাও উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের একত্রিত করে বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা প্রতিযোগিতার আয়োজন করছে। যেখানে উদ্যোক্তারা তাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা সকলের সামনে পেশ করেন। বিনিয়োগকারীরা তাদের প্রশ্নের মাধ্যমে ব্যবসার খুঁটিনাটি জেনে নেন এবং অবশেষে বিনিয়োগকারীরা পছন্দনীয় ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন। আজ আমরা এই বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে আগ্রহী করার জন্য কিছু টিপস নিয়ে আলোচনা করবো।

১. বিনিয়োগকারীদের সামনে যাওয়ার আগে কেবল ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নয়, নিজেকেও  প্রস্তুত করুন

আপনি যখন বিনিয়োগকারীদের সামনে নিজের পরিকল্পনা পেশ করছেন, তখন তারা যে কেবল আপনার বক্তব্যই শুনছেন তা নয়। আপনার পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে আপনি কতটুকু সমর্থ, তাও তারা মনে মনে যাচাই করেন। আপনার ব্যক্তিত্ব, কথা বলার ভঙ্গিমা, পোশাক ও সর্বোপরি আপনার আত্মবিশ্বাস তাদের এই যাচাইয়ের মাপকাঠি।

ছবিসূত্রঃ SlideShare

আপনাকে দেখে যদি তাদের মনে হয়, আপনার পরিকল্পনা ভালো হলেও হয়তো আপনি এই কাজে ততটা দক্ষ নন, তাহলে তারা আপনার উপর ভরসা হারিয়ে ফেলবেন। ফলে আপনার পরিকল্পনা যতই ভালো হোক না কেন, তাদের সামনে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী, চৌকস ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে।

২. গোছানো প্রেজেন্টেশন তৈরি করুন

বিনিয়োগকারীদের সামনে সাধারণত পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে পুরো ব্যবসায়িক মডেল তথা পরিকল্পনা পেশ করা হয়। অযথা অনেক সময় নিয়ে অনেক স্লাইডের উপর বক্তৃতা দিলে বিনিয়োগকারীরা বিরক্ত হতে পারেন। তাই অল্প কথায় শুধু মূল পয়েন্টগুলো ভালোমতো গুছিয়ে নিজের প্রেজেন্টেশন তৈরি করুন। আপনার ব্যবসার মডেল, প্রসারের কৌশল, বিনিয়োগ ইত্যাদি নিয়ে সুন্দর করে কম কথায় বুঝিয়ে বলুন।

ছবিসূত্রঃ 24Slides

প্ল্যানেট এন্ট্রাপ্রেনিউর  বইটির অন্যতম লেখক বেইবার্স এলট্যান্টাস বলেন,

আপনি আমেরিকা, ইউরোপ, এশিয়া না আফ্রিকায় থাকেন, সেটি কোনো বিষয় নয়। আপনার যেকোনো ভালো উদ্যোগ বা আইডিয়ার জন্য পুরো পৃথিবী অপেক্ষা করছে।

এলট্যান্টাস পরামর্শ মতে, আপনার ব্যবসার সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের জন্য ৪টি জিনিস তৈরি করা প্রয়োজন,

  • ব্যবসায়িক মডেল বর্ণনা করে আনুমানিক ৫০ পৃষ্ঠার একটি গোছানো বই
  • ব্যবসায়িক মডেল বর্ণনা করে একটি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন, যার স্লাইড সংখ্যা ২০টির বেশি নয়
  • ২ পৃষ্ঠায় এই পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের একটি সারসংক্ষেপ (কেবল প্রেজেন্টেশনের সময় বিনিয়োগকারীদের হাতে রাখার জন্য)
  • সর্বোচ্চ ৫ মিনিটের মধ্যে দেয়া যায়, ব্যবসায়িক মডেল সম্পর্কে এমন বক্তব্য

৩. বিনিয়োগকারীদের সামনে কেবল ব্যবসার শুরু নিয়ে নয়, শেষ নিয়েও বলুন

ব্যবসার মডেলে ব্যবসার শেষ দিনটি নিয়েও পরিকল্পনা করে রাখুন। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, অধিকাংশ  বিনিয়োগকারী যে কোনো ব্যবসায় সর্বোচ্চ ৭ বছর বিনিয়োগ করে থাকেন, এরপর আবার বিনিয়োগের জন্য নতুন উদ্যোক্তা খুঁজতে থাকেন।

ছবিসূত্রঃ CFO Solutions – NW, LLC

তাই হঠাৎ বিনিয়োগের ঘাটতি পড়লে আপনি কীভাবে এই ব্যবসা গুটিয়ে নিবেন, তারও একটি পরিকল্পনা আপনার মডেলে থাকা উচিত। আপনি কি তখন সব শেয়ার নতুন কোনো উদ্যোক্তার কাছে বিক্রি করে দেবেন নাকি কোনো পুঁজিবাদীর সাহায্য নিয়ে  নতুন করে ব্যবসা প্রসার ঘটাবেন, এ নিয়ে আগে থেকেই পরিকল্পনা করে রাখুন।

৪. বিনিয়োগকারীদের সম্পর্কে ভালোমতো জেনে নিন

বিনিয়োগকারী কারা হচ্ছেন, তারা এর আগে কী ধরনের ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন, কোন কোন ক্ষেত্রে তারা সফল হয়েছেন, আপনার ব্যবসা সম্পর্কে তাদের ধারণা বা আগ্রহ কতটুকু হতে পারে, ব্রেক ইভেন তথা বিনিয়োগ ও আয় সমান হবার জন্য তারা আপনাকে কত বছর সময় দিতে পারেন, সে সম্পর্কে আগে থেকেই জানার চেষ্টা করুন।

প্রশ্নোত্তর পর্বে বিনিয়োগকারীরা এগুলো সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করতেও পারেন।  তাই আপনার উত্তর যেন তাদের কাছে সন্তোষজনক হয়, সেদিকে খেয়াল রেখে উত্তর প্রস্তুত করে রাখুন। তাহলে বিনিয়োগকারীদের সামনে আপনি সাবলীলভাবেই উত্তর দিতে পারবেন।

৫. অধ্যবসায়ী ও পরিশ্রমী হোন

বিনিয়োগকারীদের সামনে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা পেশ করলেই যে আপনার কাজ শেষ হয়ে গেলো, তা নয়। এরপরেও আপনাকে তাদের সাথে বসতে হতে পারে। অন্তত ৩ মাস তারা আপনার কার্যক্রম ও অগ্রগতি খেয়াল করবেন। আপনার পণ্যের উৎপাদন, মান, খরচ সব কিছু তারা লক্ষ্য করবেন। তাই তাদের দেয়া সময়ের যথাযথ ব্যবহার করুন।

ছবিসূত্রঃ Funnyjunk

তারা যে কাজ বা মডেল আপনার কাছে চাইবেন, তা যথাযথ সময়ের মাঝেই প্রস্তুত করুন। তারা যেন মনে না করেন, আপনাকে তাদের সময় দেয়াটা অনর্থক। সর্বোপরি তাদের সামনে নিজেকে পরিশ্রমী, দক্ষ ও চৌকস হিসেবে প্রমাণ করুন।

৬. যথাযথ চুক্তিপত্র তৈরি করুন

টার্মশিট বা চুক্তিপত্র হলো যেকোনো ব্যবসায়িক চুক্তির বর্ণনাসংক্রান্ত দলিল। এটি তৈরি করাটা উদ্যোক্তাদের জন্য অনেক কঠিন একটি কাজ। তবে যে কোনো ব্যবসার জন্য চুক্তিপত্র অপরিহার্য। আর এটি কীভাবে তৈরী করতে হয়, সে সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য ইন্টারনেটেই পাওয়া যায়। কিছুদিন পড়াশুনা করে এগুলোর খুঁটিনাটি ভালো করে জেনে নিন।

৭. ব্যবসায়িক বিভিন্ন পরিভাষা জেনে রাখুন

যে কোনো উদ্যোগে কেবল ভালো আইডিয়াই যথেষ্ট নয়, পাকা ব্যবসায়ী হওয়ার জন্য ব্যবসার বিভিন্ন পরিভাষা ও এর ব্যবহার জেনে রাখাও জরুরি। বিনিয়োগকারীদের সাথে কথোপকথনের সময়ও এগুলো অনেক কাজে দিতে পারে।

আর এই টিপসগুলো মেনে চললে আপনিও আপনার নতুন ব্যবসায় বিনিয়োগের জন্য বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে পারবেন।

Featured Image: The Pitcher

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *