ব্যবসার মূলধন সংগ্রহের পর যেভাবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করবেন

ব্যবসার পরিকল্পনা যতই ভালো হোক না কেন, মূলধন ছাড়া ব্যবসা শুরু করা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আর কেবল যে প্রাথমিক পর্যায়ে পণ্য তৈরির জন্য মূলধন প্রয়োজন তা নয়। বিভিন্ন জায়গায় পণ্যের সরবরাহ এবং যে কোনো কঠিন পরিস্থিতি বা ঝুঁকি সামলানোর জন্যও কিছু অর্থ আগে থেকেই সংগ্রহ করে রাখা প্রয়োজন।

ছবিসূত্রঃ George House Trust

ছোটোখাটো ব্যবসার ক্ষেত্রে মূলধন কম হলেও চলে। কিন্তু বড় ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রয়োজন মোটা অংকের টাকা যা যোগাড় করতে প্রয়োজন হয় একাধিক বিনিয়োগকারীর। আর বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংক্রান্ত চুক্তিতে যাওয়া মানেই আপনাকে ব্যবসার লাভসহ অনেক বিষয়ে তাদের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে হবে এবং প্রয়োজনে জবাবদিহি করতে হবে।

তাই আপনার ব্যবসার মূলধনের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ সংগ্রহ হলেও দুশ্চিন্তা এখানেই শেষ নয়।  এর পরবর্তীতে আপনাকে ব্যবসা, লাভ ও বিনিয়োগকারী সবকিছু সমান তালে সামলাতে হবে। আর আপনি যে কাজগুলো করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করতে পারেন, তা নিয়েই আলোচনা করা হলো এই প্রবন্ধে।

১. প্রত্যেক বিনিয়োগকারীকে নিয়মিতভাবে ব্যবসার চলমান অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করুন

অনেক নতুন উদ্যোক্তা ভেবে থাকেন যে, বিনিয়োগকারীরা কেবল লাভের আশায়ই কোনো ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন এবং সবসময় লাভ হচ্ছে কী না সেটাই জানতে চান। কিন্তু এটা ঠিক নয়। অধিকাংশ বিনিয়োগকারী ৩টি কারণে যে কোনো ব্যবসায় বিনিয়োগ করে থাকেন।

  • উদ্যোক্তার কথা শুনে যদি বিনিয়োগকারীর মনে হয় যে, সে যথেষ্ট পরিশ্রমী, অধ্যবসায়ী ও দৃঢ়চিত্ত এবং যে কোনো কঠিন পরিস্থিতি সামলানোর মনোবল তার আছে।
  • উদ্যোক্তা যে পণ্য বা সুবিধা নিয়ে ব্যবসা করতে চান, তা নিয়ে যদি বিনিয়োগকারীর  ইতিবাচক অভিজ্ঞতা থাকে।
  • বিনিয়োগকারী যদি বিনিয়োগ ছাড়াও সরাসরি ব্যবসার কোন কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ পান।
ছবিসূত্রঃ DMG Consulting LLC

যে কোনো বিনিয়োগকারীর আস্থা অর্জনের জন্য আপনাকে হতে হবে সৎ, দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী। ব্যবসার চলমান অবস্থা, লাভক্ষতি, খরচজমা সবকিছুর সঠিক হিসেব করে একটি রিপোর্ট তৈরি করুন। প্রতি মাসে বা নির্দিষ্ট সময় পর পর আপনার ব্যবসার প্রত্যেক বিনিয়োগকারীকে মেইল বা চিঠির মাধ্যমে তা জানিয়ে দিন। বিনিয়োগকারীরা নিজে থেকে কিছু জানতে চাওয়ার আগেই আপনিই তাদেরকে এ সম্পর্কে অবহিত করুন। প্রয়োজনে তাদের পরামর্শ চেয়ে নিন।

এভাবে বিনিয়োগকারীদের সাথে একটি হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলুন, যেন কোন কারণে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়িক মন্দা চললেও তারা ধৈর্য ধারণ করেন এবং বিনিয়োগ তুলে নেয়ার কথা না ভাবেন।

তবে ব্যবসার কৌশল হিসেবে এটিও প্রচলিত যে, ব্যবসায় হঠাৎ কোনো দুঃসময় চলে এলে আগে তা নিজে  মোকাবেলা করার চেষ্টা করুন। একান্ত না পারলে তবেই বিনিয়োগকারীদের অবহিত করুন। নতুবা তারা আপনাকে উদ্যোক্তা হিসেবে অযোগ্য মনে করতে পারেন। তখন তাদের মনে আপনার উপর আস্থার বদলে অনাস্থা তৈরি হবে।

২. বোর্ড অব ডিরেক্টরস নির্বাচিত হওয়ার আগেই একটি বোর্ড মিটিং করে দেখান

বড় ব্যবসার ক্ষেত্রে বোর্ড অফ ডিরেক্টরস নির্বাচন করা একটু সময়সাধ্য ব্যাপার হতে পারে। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের জন্য আপনি বোর্ড অব ডিরেক্টরদের ছাড়াই একটি বোর্ড মিটিং করে দেখাতে পারেন । প্রত্যেক বিনিয়োগকারীকে এই মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করার আমন্ত্রণ জানান। আগে থেকে একটি অনুষ্ঠান সূচি তৈরি করুন এবং যে কোন বোর্ড মিটিংয়ে যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়, তার কোনোটিই যেন আপনার মিটিংয়ের আলোচনায় বাদ না পড়ে, সে দিকে খেয়াল রাখুন।

ছবিসূত্রঃ BetaKit

আলোচ্য বিষয়গুলোর সারসংক্ষেপ ও তথ্য একটি কাগজে প্রিন্ট করে প্রত্যেক বিনিয়োগকারীকে সরবরাহ করতে পারেন। আপনার ব্যবসার বিনিয়োগকারীদের সামনে প্রমাণ করুন যে, আপনি জানেন, কীভাবে তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হয়, তাদের সময়কে মূল্য দিতে হয় এবং তাদের পরামর্শ মেনে চলার চেষ্টা করতে হয়।

৩. বিনিয়োগকারীদেরকেও কোম্পানির বিভিন্ন কাজের দায়িত্বভার প্রদান করুন

বিনিয়োগ ছাড়াও প্রত্যেক বিনিয়োগকারীর বিভিন্ন ব্যবসায়িক দিকে দক্ষতা রয়েছে। যদি তাদের দক্ষতা অনুযায়ী আপনার কোম্পানির কোনো কাজের দায়িত্ব তাদের দেন, তবে কোম্পানির সাথে তাদের একাত্মতা আরও বৃদ্ধি পাবে। তখন তারা উদ্যোক্তাকে জবাবদিহি করতে বলবেন না। বরং কোম্পানির সম্যক অবস্থা জানার কারণে নিজেরাই ব্যতিব্যস্ত হয়ে কোম্পানির কল্যাণে কাজ করবেন।

ছবিসূত্রঃ The Flipping Formula

তাছাড়া আপনার সাথে বিনিয়োগকারীদের আন্তরিকতাও বৃদ্ধি পাবে। যে কোম্পানিতে  বিনিয়োগকারীরাই সরাসরি কোম্পানি পরিচালনার বিভিন্ন দায়িত্বে থাকেন, সে কোম্পানিতে উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীর সম্পর্ক যেমন মজবুত হয়, তেমনি কাজও মানসম্মত হয়। সেই সাথে লাভও আশানুরূপ হয়ে থাকে।

৪. প্রয়োজনে ‘না’ বলতে শিখুন

ছবিসূত্রঃ The Startup Garage

বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, উদ্যোক্তা হিসেবে আপনি সকল বিনিয়োগকারীর সব কথা মানতে বাধ্য। তাই কী করে আপনি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করবেন সেই উপায় জানা যেমন জরুরি, তেমনি সঠিক সময়ে তাদের ভুল কোনো সিদ্ধান্তে না বলতে শেখাও জরুরি।

অনেক সময় তারা এমন সব পরামর্শ আপনাকে দিতে পারেন, যা আপনার ব্যবসার মডেলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সেক্ষেত্রে তাদের কথা মেনে চলা আপনার ব্যবসার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এমন হলে আপনি কৌশলে অন্যান্য বিনিয়োগকারী বা উদ্যোক্তাদের সাথে আলোচনা করে সুন্দরভাবে তাদের পরামর্শের নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরুন।

 

Featured Image: Africa Business Classroom

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *