ডেভিড সারনফ: ফাদার অব ব্রডকাস্টিং

source:google.com

বর্তমান যুগে টেলিভিশনের রিমোট হাতে নিয়ে টেলিভিশন চালু করলেই আমাদের চোখের সামনে খুলে যায় বিশাল এক রঙিন দুনিয়া। যাকে অামরা ‘রঙিন টেলিভিশন’ বলে আখ্যায়িত করে থাকি। এই রঙিন টেলিভিশন প্রযুক্তি ডেভিড সারনফের উদ্ভাবিত মৌলিক ধারণাগুলোর ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। তিনি ছিলেন আমেরিকান টেলিভিশন ও বেতার শিল্পের একজন সফল উদ্যোক্তা। টেলিকমিউনিকেশন সিস্টেমকে তিনি এক নতুন মাত্রা দান করেছিলেন।

source:google.com

বলা যায় টেলিকমিউনিকেশন শিল্পে তিনি একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। দুনিয়াকে বদলে দেওয়ার জন্য যে কারিগরেরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন তাদের মধ্যে ডেভিড সারনফ অন্যতম। আজকের এই লেখায় আমরা তার জীবন ও কাজকর্ম সম্পর্কে জানব। তো চলুন জেনে নিই তার সাফল্যময় জীবনী।

শৈশব

ডেভিড সারনফ ১৮৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার মিন্স্কের (বর্তমানে বেলারুশ) উজলিয়ান প্রদেশে এক ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম ছিল আব্রাহাম সারনফ এবং মায়ের নাম ছিল লিয়াহ সারনফ। আব্রাহাম সারনফ ১৮৯৫ সালে অতিরিক্ত রোজগারের আশায় যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং পুরো পরিবারকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। ডেভিডের বাল্যকালের বেশির ভাগ সময় একটি চেডারে (ইহুদি শিক্ষালয়) ‘তোরাহ’ (ইহুদি ধর্মগ্রন্থবিশেষ) মুখস্থ করতে কেটেছে।

source:google.com

১৯০০ সালে ডেভিড সারনফ তার তিন ভাই, এক বোন ও মায়ের সাথে নিউইয়র্কে চলে আসেন। এখানে এসে তিনি লেখাপড়ার পাশাপাশি তার পরিবারের জন্য বাড়তি কিছু আয়ের উদ্দেশ্যে পত্রিকা বিক্রি করতে শুরু করেন। ১৯০৬ সালে তার বাবা যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

source:google.com

বড় ছেলে হওয়ার কারনে মাত্র ১৫ বছর বয়সে পুরো পরিবারের দায়িত্ব ডেভিড সারনফের কাঁধে এসে পড়ে। তখন তিনি সম্পূর্ণভাবে পত্রিকার ব্যবসা শুরু করার পরিকল্পনা করেন। পরবর্তীতে কমার্শিয়াল কেবল কোম্পানি নামক একটি প্রতিষ্ঠানে অফিস বয় হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান।

কর্মজীবন

কমার্শিয়াল কেবল কোম্পানিতে কিছুদিন কাজ করার পর ডেভিড সেখানকার চাকরি ছেড়ে দিয়ে ১৯০৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর মার্কনী ওয়্যারলেস টেলিগ্রাফ কোম্পানি অব আমেরিকায় কাজ শুরু করেন। এই চাকরির মধ্য দিয়েই তিনি তার সুদীর্ঘ ৬০ বছরের কমিউনিকেশনস ক্যারিয়ারের সূচনা করেন।

পরবর্তী ১৩ বছরে তিনি পদোন্নতির মাধ্যমে অফিস বয় থেকে কমার্শিয়াল ম্যানেজারের দায়িত্ব পান এবং ইলেকট্রনিক কমিউনিকেশন সম্পর্কে যথেষ্ট পরিমান জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এরপর তিনি জন ওয়ানামেকার রেডিও স্টেশনে একজন অপারেটর হিসেবে নিযুক্ত হন।

source:google.com

তিনিই প্রথম ব্যক্তি ছিলেন যিনি ১৯১২ সালের ১২ এপ্রিল টাইটানিক থেকে আসা আপদকালীন কলটি গ্রহন করেন। এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য উপহারস্বরূপ তিনি মার্কনী ইন্সটিটিউটে একজন রেডিও ইন্সপেক্টর এবং ইন্সট্রাক্টর হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। পরবর্তীতে তিনি চীফ ইন্সপেক্টরের পদ পান।

সারনফের উদ্ভাবিত ধারণা গুলোর মধ্যে অন্যতম ধারণা ছিল যে কিভাবে ঘরে বসে কোন তারের ব্যবহার ছাড়াই গান শোনা যায়। তিনি চেয়েছিলেন রেডিও ডিভাইসকে শুধুমাত্র জাহাজের ক্ষেত্রে ব্যবহার না করে সর্বসাধারণের কাছে গান শোনা ও বিভিন্ন আনন্দদায়ক অনুষ্ঠান প্রচারের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে। এই লক্ষ্যে তিনি একটি নিজস্ব সম্প্রচার কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন যার নাম ছিল ন্যাশনাল ব্রডকাস্টিং কোম্পানি (এনবিসি)। পরবর্তীতে এই কোম্পানিতে প্রায় একশটিরও বেশি রেডিও স্টেশন যুক্ত হয়। এছাড়া তিনি বিভিন্ন রেলপথেও রেডিও ব্যবহার করে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

source:google.com

তিনি নিউইয়র্কের ওয়ানামেকার রেডিও স্টেশন থেকে গান সম্প্রচার করে সবাইকে হতবাক করে দেন। দূরবর্তী স্থানে সম্প্রচারের সফলতায় অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি মার্কনী কোম্পানির প্রেসিডেন্ট এডওয়ার্ড জে ন্যালির নিকট একটি প্রস্তাব দেন। সারনফ তার কোম্পানিকে নতুন সৃষ্টি হওয়া রেডিও বাজারের জন্য ‘রেডিও মিউজিক বক্স’ নামে একটি যন্ত্রের উন্নতি সাধন করতে বলেন। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কথা মাথায় রেখে ন্যালি সেই প্রস্তাবে কাজ করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে ডেভিড সারনফ আরসিএতে (রেডিও কর্পোরেশন অব আমেরিকা) ইনচার্জের দায়িত্ব পান।

ব্যবসায়িক ক্যারিয়ার

রেডিও আবিষ্কারের প্রথমদিকে শুধুমাত্র দুই জন মানুষের মাঝে এটি ব্যবহার করা যেত। তখন একজন কথা বলতো আর অপরদিকে মানুষ সেটা শুনত। কিন্তু ডেভিড এই প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করতে চেয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন রেডিওতে যদি একজন মানুষ কথা বলে তবে সেটা যেন অনেক মানুষ একসাথে শুনতে পায়। তিনি রেডিওকে ব্যবহার করে একটি ব্যবসা দাঁড় করানোর জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন কিন্তু তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ বার বার তার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন।

তবুও তিনি আশাহত হননি। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে ১৯২১ সালে তিনি জ্যাক ডেম্পসি ও জর্জ কার্পেন্টিয়ার মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়া একটি হেভিওয়েট বক্সিং ম্যাচ সম্প্রচারের মাধ্যমে রেডিও ব্যবসার বাজার গরম করে তোলেন। এই সম্প্রচারটি ৩,০০,০০০ লোক একযোগে শ্রবন করেছিল এবং বাড়িতে ব্যবহারযোগ্য রেডিও ইকুইপমেন্টের চাহিদা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি করে তুলেছিল। ১৯২২ সালে সারনফের ব্রডকাস্টিংয়ে জনগণের চাহিদা নিয়ে করা ভবিষ্যতবাণী সত্যি হয়। এরফলে পরবর্তী ১৮ মাসে ডেভিড সারনফ ব্যাপক প্রভাব ও খ্যাতি অর্জন করেন।

source:google.com

এরপর ১৯২৫ সালে আরসিএ তাদের প্রথম রেডিও স্টেশন ক্রয় করে এবং ন্যাশনাল ব্রডকাস্টিং কোম্পানির যাত্রা আরম্ভ করে যা ছিল আমেরিকার প্রথম রেডিও নেটওয়ার্ক। চার বছর পর ডেভিড আরসিএ এর প্রেসিডেন্ট হন। অনেকে মনে করেন যে ডেভিড সারনফ আরসিএ এবং এনবিসি উভয়েরই প্রতিষ্ঠাতা কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি শুধুমাত্র এনবিসি এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।

রেডিও শিল্পের ব্যাপক সফলতার পর তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে টেলিভিশন প্রযুক্তিতেও সফলতা অর্জন করা সম্ভব। এই লক্ষ্যে তিনি ইঞ্জিনিয়ার ভ্লাদিমির ওরিকিনের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং গবেষণার জন্য অনুদান দিতে আগ্রহী হন। এই পুরো প্রকল্পটি প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলারের ছিল। তবে এই প্রকল্পটি টেলিভিশনের প্রকৃত আবিষ্কারক ফিলো টি ফ্রান্সওর্থ যিনি চলমান ছবির পেটেন্ট তৈরি করেছিলেন তার সাথে বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল।

source:google.com

তবে সারনফ তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন এটা প্রমাণ করতে যে প্রকৃতপক্ষে তিনিই হচ্ছেন টেলিভিশনের আসল আবিষ্কারক। এই বিতর্কের অবসানের জন্য তিনি মিলিয়ন ডলার রয়্যালিটি দিয়েছিলেন। পরে ডেভিড সারনফের এনবিসি সর্বপ্রথম একটি ভিডিও টেপ সম্প্রচার করার গৌরব অর্জন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর টেলিভিশন কোম্পানিগুলো রঙিন টেলিভিশনের দিকে নজর দেয়।

source:google.com

১৯৫০ সালের ১০ অক্টোবর এফসিসি (ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন) এনবিসি এর তৈরি রঙিন টেলিভিশন সিস্টেমকে অনুমোদন না দিয়ে সিবিএস (কলম্বিয়া ব্রডকাস্টিং সিস্টেম) এর তৈরি রঙিন টেলিভিশন সিস্টেমকে অনুমোদন দেয়। কিন্তু সারনফ সুপ্রিম কোর্টে আপিল করার পর এফসিসির রায় বাতিল হয়ে যায়। অবশেষে এই যুদ্ধেও সারনফ জয়ী হয়। পরবর্তীতে ১৯৫১ সালে আরসিএ রঙিন টেলিভিশন সেট উৎপাদনে শীর্ষ স্থান লাভ করে। এভাবেই রঙিন টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হয় এবং জনপ্রিয়তা লাভ করে।

ব্যক্তিগত জীবন

ডেভিড সারনফ ১৯১৭ সালের ৪ জুলাই লিজেট হারমান্তকে বিয়ে করেন। তাদের পরিবারে তিনটি পুত্রসন্তানের আগমন ঘটে। তাদের নাম যথাক্রমে রবার্ট ডব্লিউ সারনফ, এডওয়ার্ড সারনফ ও থমাস ডব্লিউ সারনফ। ডেভিড সারনফের চাচাতো ভাই ইউজিন লায়ন্স ছিলেন একজন লেখক ও জার্নালিস্ট যিনি ডেভিড সারনফের জীবনী রচনা করেন।

source:google.com

মৃত্যু

১৯৭১ সালের ১২ ডিসেম্বর এই মহারথী নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। তিনি পুরো পৃথিবীকে যেভাবে বদলে দিয়েছেন তা সত্যিই অভাবনীয়। এই পৃথিবী তার কাছে চিরঋণী হয়ে থাকবে।

source:google.com

সারনফ জাদুঘর

ডেভিড সারনফের স্মরণে ‘দ্যা ডেভিড সারনফ লাইব্রেরি’ নামে একটি জাদুঘর জনসাধারণের জন্য নির্মাণ করা হয়। এটি জাদুঘরের পাশাপাশি একটি গ্রন্থাগারও। এখানে সারনফের জীবনের সাথে জড়িত বিভিন্ন ঐতিহাসিক বস্তু সংরক্ষিত আছে। জাদুঘরটি নিউ জার্সির প্রিন্সটন জংশনে অবস্থিত।

source:google.com

অর্জনসমূহ

  • ১৯৫১ সালে তিনি ‘নাইট’ উপাধি লাভ করেন।
  • ১৯৫১ সালে তিনি ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্যা রেসিসটেন্স’ উপাধি পান।
  • সারনফ ১৯৪৪ সালে ইউএস আর্মির পক্ষ থেকে ‘লীজান অব মেরিট’ পদক লাভ করেন।
  • ১৯৫৩ সালে তিনি ‘ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ব্রডকাস্টারস হল অব ফেম’ অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন।
  • মৃত্যুর পর ১৯৮৪ সালে তিনি ‘টেলিভিশন হল অব ফেম’ উপাধিতে অভিষিক্ত হন।
  • মৃত্যুর পর ১৯৮৯ সালে তিনি ‘রেডিও হল অব ফেম’ উপাধিতে ভূষিত হন।
  • মৃত্যুর পর ২০১৪ সালে তিনি ‘নিউ জার্সি হল অব ফেম’ উপাধিতে অভিষিক্ত হন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *