যেকোনো অলাভজনক কাজ শুরু করার আগে যে বিষয়গুলো নিয়ে ভেবে নেয়া উচিত

আপনি কি কখনও আশপাশের যে কোনো সমস্যা নিয়ে চিন্তা করে তার কোনো অভিনব ও কার্যকর কোনো সমাধান বের করেছেন? বেশিরভাগ মানুষই চারপাশের সমস্যাগুলোর সাথে নিজেকে স্বাভাবিকভাবে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। অনেকে আবার ভাবেন, কিছুদিন পর কেউ না কেউ এর সমাধান নিয়ে হাজির হবে এবং দুনিয়া পাল্টে যাবে।

কেউ আবার নিজে সমাধান বের করে ও তা কাজে লাগিয়ে উদ্যোক্তা হবার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ আবার এই সমাধানগুলো জনসেবায় কাজে লাগানোর জন্য অলাভজনক কার্যক্রম শুরু করেন।

ছবিসূত্রঃ SCORE.org

একসময় ব্যবসা আর এই অলাভজনক কার্যক্রমের মধ্যে বেশ বিভেদ ছিল। কিন্তু এখন প্রায় সব উদ্যোক্তারা সামাজিক দায়বোধ থেকে কিংবা ব্যবসার প্রচার ও প্রসারের জন্য অলাভজনক কিছু কার্যক্রমকে বিজনেস মডেলেই পরিকল্পনা করে রাখেন।

বর্তমানে সবচেয়ে ভালো অলাভজনক কার্যক্রমগুলোকে সচল ও লাভজনক ব্যবসার মতো করেই পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে এজন্য চাই একটি সুন্দর ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, পরবর্তীতে কাজের ফলাফল কি হতে পারে তা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা, দূরদর্শিতা, যথাযথ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা এবং অবশ্যই আপনার সুদৃঢ় ইচ্ছাশক্তি।

যদিও অলাভজনক কার্যক্রম থেকেও লাভ ব্যতীত অন্যান্য অনেক কিছু প্রাপ্তির বিষয়ও আছে, তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতা ও অসুবিধা সম্পর্কেও আপনার সচেতন থাকা উচিত।

১. প্রতিযোগিতা এড়িয়ে চলুন

ছবিসূত্রঃ Tutorialspoint

আপনি যে অলাভজনক কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছেন, তা অন্য কোনো কোম্পানি বা দল শুরু করেছে কি না নিশ্চিত হোন। যদি এমন হয়ে থাকে, তবে চেষ্টা করুন সেই কোম্পানি বা দলের হয়ে কাজ করতে। কারণ অলাভজনক কার্যক্রমে প্রতিযোগিতার কিছু নেই। একা কিছু করার জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক উৎস বা ফান্ড প্রয়োজন। অবশ্যই আপনি এই ফান্ডের পুরোটাই নিজের ঘর থেকে যোগাড় করতে পারবেন না। ফান্ড বৃদ্ধির জন্য অন্য অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোও বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছে। তাই নতুন করে, একই কাজের জন্য ফান্ড পাওয়া সহজ নাও হতে পারে।

২. ট্যাক্সের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকুন

অলাভজনক প্রতিষ্ঠান শুরু করার প্রধান সুবিধা হলো রাষ্ট্র কর্তৃক ট্যাক্স বা আয়কর থেকে দায়মুক্ত থাকা। এর অর্থ হলো, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান সমস্ত আইনানুগ কাগজপত্র ও প্রমাণ দেখিয়ে যথাযথ লাইসেন্স পেয়ে গেলে এর ফান্ড বা অর্থের উপর সরকার ট্যাক্স আরোপ করে না।

কিন্তু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে তাদের বাৎসরিক লাভের একটি বড় অংশ আয়কর হিসেবে দিতে হয়। এজন্য দেখা যায়, অনেক লাভজনক বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের লাভের অংশ থেকে অলাভজনক কার্যক্রম শুরু করেন। এতে তাদের ট্যাক্সের পরিমাণও কমে, আবার এই কার্যক্রমের মাধ্যমে তাদের ব্যবসায়িক প্রচারও হয়ে যায়।

২. আয়ের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হোন

ছবিসূত্রঃ sonalisokal.com.bd

অনেক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সম্পূর্ণভাবে সর্বসাধারণের ও ব্যক্তিগত অনুদানের উপর নির্ভরশীল। আবার অনেকে লাভজনক ব্যবসার পাশাপাশি অলাভজনক কার্যক্রম করে থাকেন। আপনার অলাভজনক কার্যক্রম শুরু করার আগে আপনিও এর আয়ের উৎস নিশ্চিত করুন।

৪. কর্তৃত্ব ছেড়ে দিতে শিখুন

একা একা কোনো অলাভজনক কার্যক্রম বেশিদিন চালানো যায় না। তাছাড়া যে কোনো অলাভজনক প্রতিষ্ঠান যদি ট্যাক্সের কবল থেকে মুক্তি পেতে চায় তবে নিয়ম অনুযায়ী অবশ্যই তার একটি বোর্ড অফ ডিরেক্টরস থাকতে হবে।

তাই আপনি যখন আপনার প্রতিষ্ঠানের জন্য বোর্ড অফ ডিরেক্টরস এর সদস্যদের নির্বাচন করবেন, তখন এমন ব্যক্তিদের পছন্দ করুন যাদের সাথে আপনার মানসিকতা, মতামত ও ইচ্ছা মিলে যায়। নতুবা যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে ঝামেলায় পড়তে হতে পারে। এতে আপনার অর্থ ও সময় দুইই নষ্ট হবে।

৫. লক্ষ্য স্থির রাখুন

অলাভজনক কার্যক্রম বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত নীতি অনুযায়ী প্রথমেই এর যে লক্ষ্য লিখিতভাবে নির্ধারিত হয়, পরবর্তীতে তা আর খণ্ডন করা পরিবর্তন করা যায় না। আর করলেও অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এদিকে পরিস্থিতি, আর্থিক অবস্থা বা সামাজিক প্রয়োজনীয়তা থেকে আপনি যে কোনো সময় এর কার্যক্রম বা লক্ষ্যে পরিবর্তন আনতে চাইতে পারেন।

অন্যদিকে লাভজনক ব্যবসার ক্ষেত্রে যে কোনো মুহূর্তেই মার্কেটের চাহিদা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিবর্তন করা যায়। তাই অলাভজনক কার্যক্রম শুরু করার সময়ই আপনার লক্ষ্য ও কার্যক্রম সম্পর্কে স্থির সংকল্প করুন।

৬. কাগজপত্র সংক্রান্ত বিষয়াদি মাথায় রাখুন

ছবিসূত্রঃ Digital Trends

রাষ্ট্রে লাভজনক বা অলাভজনক যে কাজই আপনি করতে চান না কেন আপনাকে সরকারের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। এজন্য কিছু আইনানুগ কাগজপত্র, লাইসেন্স ইত্যাদির প্রয়োজন হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হবে যে, অন্যান্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের জন্য যে কাগজপত্র দরকার হয়, অলাভজনক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে মূলনীতি, পরিচয়পত্র, লক্ষ্য, কাজের ধারা ও প্রমাণ ইত্যাদি সম্পর্কিত অনেক বেশি কাগজ তৈরি করতে হয়, সরকারের নজরদারিতেও থাকতে হয়। তাই ঝামেলাও বেশি হয়।

আপনি অলাভজনক ও জনসেবামূলক কাজ করবেন বলেই যে রাষ্ট্র আপনাকে ট্যাক্স থেকে অব্যাহতি দেবে, ব্যাপারটি ততটাও সহজ নয়। তাই এগুলো সম্পর্কেও আগে থেকে ধারণা নিয়ে নিন।

৭. অর্থ বন্টনে সতর্ক থাকুন

ব্যবসায়িক বা সেবামূলক যে কোনো কাজেই প্রয়োজন প্রচুর অর্থ আর জনশক্তি। তাই অনেক ধাপে বিভিন্ন কাজের জন্য অর্থ বিভিন্ন লোকের হাতে স্থানান্তরিত হয়। আর এই অর্থ বন্টনে সতর্ক থাকুন। অলাভজনক কার্যক্রমের ফান্ডের টাকা কারো ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। যদি কোনো নির্দিষ্ট কাজের জন্য যোগাড়কৃত টাকা কাজ শেষেও অবশিষ্ট রয়ে যায়, তবে তা অন্য সেবামূলক কাজের জন্য বরাদ্দ করা উচিত যেন তা ভোগদখল না হয়ে যায়।

ছবিসূত্রঃ poetsandquants.com

অলাভজনক বা জনসেবামূলক কাজ করা অবশ্যই উত্তম। সকলেরই উচিত কর্মজীবনের পাশাপাশি এরকম কিছু কাজে নিজেকে জড়িত রাখা। কিন্তু তার আগে এর খুঁটিনাটি সম্পর্কে জেনে রাখাও অত্যন্ত প্রয়োজন।

Featured Image: Nonprofit Hub

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *