যেভাবে হাইপ চক্রের ঢালে হতে পারে ব্যবসার উত্থান

ছবিসূত্র : https://www.shutterstock.com/image-illustration/conceptual-business-illustration-words-hype-cycle-1006932880

আজ আমরা আছি এমন এক সময়ে যেখানে আমাদের জীবনব্যবস্থা পুরোটাই প্রযুক্তি নির্ভর বললে অত্যুক্তি হবে না। আমাদের জীবনব্যবস্থায় প্রযুক্তির অবস্থানের কথাও বলার অপেক্ষা রাখে না। আজ মানুষ যা ভাবতে পারছে, হয়তো দশ বছর আগেও তা ছিল স্বপ্নের মতো। প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত আমাদের নিয়ে যাচ্ছে নতুন এক উচ্চতায়। প্রতিদিনই প্রযুক্তির অভিধানে আসছে নতুন নতুন সংযোজন যা মানুষকে উৎসাহিত করছে এবং আগ্রহী করে তুলছে সেই প্রযুক্তি সম্পর্কে জানতে।

আর প্রযুক্তির এই নিত্য নতুন সংযোজনগুলোর খবর আমরা জানতে পারছি প্রতিষ্ঠানগুলোর আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে, যা আমাদেরকে উৎসাহিত করছে সেই প্রযুক্তি গ্রহণে। এভাবেই  প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ব্যবসার প্রসার ঘটাচ্ছে, আর নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো করছে তাদের ব্যবসার সূচনা। আর এই ব্যবসার উত্থানে হাইপ চক্রের প্রভাব নিয়েই আজকের এই আলোচনা।

ছবিসূত্র : youtube.com

হাইপ চক্র 

এবার জেনে নেয়া যাক হাইপ চক্র বলতে আমরা আসলে কী বুঝি। হাইপ চক্র বুঝতে হলে আগে আমাদের জানতে হবে হাইপ কী। আধুনিক যুগের বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে হাইপ খুবই প্রচলিত একটি ইংরেজি শব্দ। আক্ষরিক অর্থে হাইপ বলতে এমন কিছু বোঝায় ,যা খুব সহজে এবং দ্রুত মানুষের মাঝে কোন কিছুর ব্যপারে উৎসাহ সৃষ্টি করতে পারে। এবং যত দ্রুত এ উৎসাহ সৃষ্টি হয়, তত দ্রুত তা হারিয়ে যায়।

আধুনিক যুগে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপণন কৌশলের মূল লক্ষ্যই থাকে মানুষের মাঝে এই হাইপ সৃষ্টি করা, যাতে দ্রুত তাদের নতুন প্রযুক্তির প্রসার ঘটে ও বিপণন বৃদ্ধি পায় এবং ব্যবসার প্রসার ঘটে। কিন্তু বাস্তবে  সবসময় এমনটা ঘটে কি না, তা জানা যায় হাইপ চক্রের মাধ্যমে।

হাইপ চক্র হলো এমন একটি উপস্থাপনা যেখানে গ্রাফের মাধ্যমে একটি নতুন প্রযুক্তির গবেষণাকাল থেকে শুরু করে সেই প্রযুক্তির গ্রহণযোগ্যতা , চাহিদার পরিপক্কতা বিচার বিশ্লেষণ করে ব্যবসার লাভজনক বিনিয়োগকাল নির্ণয় করা যায়।

ছবিসূত্র :gartner.com

হাইপ চক্রের মাধ্যমে যে কোন নতুন প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসার সময়কালকে ৫ ভাগে ভাগ করা যায়।

১. উদ্ভাবিত নতুন প্রযুক্তির উৎসাহ

কোন নতুন প্রযুক্তি যখন উদ্ভাবিত হয়, তখন সেই প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে উদ্ভাবিত নতুন কোন জিনিস বা পণ্যের ধারনা মানুষের মধ্যে উৎসাহ সৃষ্টি করে ।

২. স্ফীত প্রত্যাশার চূড়া 

নতুন উদ্ভাবিত প্রযুক্তির প্রকাশের শুরুর দিকে বিজ্ঞাপন যে উৎসাহ সৃষ্টি করে, তা থেকে সাফল্য আসে।

৩. ভ্রান্তিমোচন 

নতুন উদ্ভাবিত প্রযুক্তির প্রতি উৎসাহ কমতে থাকে, যখন প্রতিষ্ঠানগুলো তা প্রয়োগ ও উৎপাদনে ব্যর্থ হয়। বিনিয়োগকারীরা তবুও বিনিয়োগ অব্যাহত রাখেন, যদি চলমান প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি অনুযায়ী  চাহিদা মাফিক উৎপাদন করতে পারে।

৪. উত্তরণ ঢাল 

এই পর্যায়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের প্রযুক্তির স্থায়ী ও নিরাপদ বাজার সম্বন্ধে আশ্বস্ত করে এবং তারা তাদের প্রযুক্তির আরও উন্নত সংস্করণ আনে। যাতে করে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগে আগ্রহী হয়। এক্ষেত্রে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করে, তবে রক্ষণশীল প্রতিষ্ঠানগুলো পিছিয়ে যায়।

৫. উৎপাদন স্থিতিশীলতা 

প্রযুক্তির নতুন সংস্করণ সফলতা পায় এবং বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন স্থিতিশীলতা ও স্থায়ী বাজার নিশ্চিত হয়।

হাইপ চক্রের ব্যবহার

হাইপ চক্র সাহায্য করে,

  •  কোন নতুন প্রযুক্তিকে ঘিরে যে উৎসাহ সৃষ্টি হয় তার থেকে সেই প্রযুক্তির মূল অর্থনৈতিক চলকগুলো আলাদা করতে
  •  প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমাতে
  • বস্তুনিষ্ঠ ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে কোন প্রযুক্তির ব্যবসায়িক মূল্য নির্ধারণে

হাইপ চক্রের মূল কথা হলো, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ যা ব্যবসার জন্য লাভজনক। আমরা  অনেক সময় এই সঠিক সময়কে যে কোন ব্যবসাকে  সর্বপ্রথম বিনিয়োগের সাথে মিলিয়ে ফেলি। কোন নতুন প্রযুক্তি ব্যবসায় প্রথম দিকের বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোই যে সবসময় লাভবান হবে, এমন কোনো কথা নেই ।

ছবিসূত্র : webdesignerdepot.com

উদাহরণস্বরূপ বলা যায় অ্যাপলের কথা। অ্যাপল অবশ্যই  কম্পিউটার, এমপিথ্রি, স্মার্টফোন বাজারে আনা প্রথম প্রতিষ্ঠান নয়। কিন্তু তারা সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করেছে ও সুযোগ বুঝে বিনিয়োগ করেছে। তাই তারা রাজত্ব করছে প্রযুক্তি বাজারে। এরকম আরো অনেক প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আছে, যারা তাদের ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রথম সারিতে ছিল না। যেমন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ইত্যাদি।

ছবিসূত্র : oecampbell.me

ইন্সটাগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা কেভিন সিস্ট্রোম বলেন যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি দেয়া যাবে এবং তা স্মার্টফোনে ব্যবহার করা যাবে এই ধারণা তারাই প্রথম উদ্ভাবন করেননি। কিন্তু তারা ইনস্টাগ্রাম প্রতিষ্ঠা করেছেন।এর ফলে স্মার্টফোনের ক্যামেরার ছবির মান বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মানুষ তাদের স্মার্টফোনে তোলা ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিতে আরো উৎসাহিত হয়েছে। যদিও এটা কেভিন সিস্ট্রোম সহজ স্বীকারোক্তিতে জানিয়েছেন, ইন্সটাগ্রাম প্রতিষ্ঠার সময়  পরিকল্পিত কোন পদক্ষেপ ছিল না। কিন্তু হাইপ চক্র অনুযায়ী তা ছিল কার্যকরী।

ছবিসূত্র : dailygkaffairs.com

তবে এটা বলা বাহুল্য যে, সকল প্রযুক্তির সাফল্য হাইপ চক্র অনুসরণ করে না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কথা। বর্তমানে পৃথিবীব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা চলছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ধারণা যখন প্রথম আসে, তখন থেকে এখন পর্যন্ত হাইপ চক্র অনুযায়ী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আছে তার তৃতীয় উচ্চতর স্তরে। অথচ হাইপ চক্রে এর কোন অস্তিত্ব নেই। এবং এই তৃতীয় উচ্চতর স্তরে থাকার পূর্বের দুটি ঢালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা  কোন সুস্পষ্ট বাস্তব প্রয়োগ দেখাতে পারেনি।

কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নতুন প্রযুক্তির সাফল্য আসে হাইপ চক্রের মূলনীতি মেনে। এটি একটি নতুন প্রযুক্তির  স্থিতিশীলতা বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগের সঠিক সময় নির্ণয়েও সাহায্য করে। আর এভাবেই হাইপ চক্রের মূলনীতি মেনে ও প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে, সঠিক সময়ে বিনিয়োগে সৃষ্টি হতে পারে একটি সফল ও লাভজনক ব্যবসা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *