যে ১০ টি দেশে একজন একাউন্ট্যান্ট পাবেন সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক

একজন একাউন্ট্যান্ট বা হিসাবরক্ষকের কাজকে পৃথিবীর সবচেয়ে মজাদার কিংবা আনন্দদায়ক কাজ বলা না গেলেও বলা যায় এটি একটি লাভজনক পেশা। আপনি যদি সংখ্যা নিয়ে খেলতে ভালোবাসেন, তবে একাউন্ট্যান্ট পেশাটি আপনার জন্যই। কিন্তু বাংলাদেশে বসেই কি আপনি এই পেশায় সফলতা অর্জন করতে পারবেন? আপনার স্বপ্নের ক্যারিয়ার গড়তে হলে কোথায় পাড়ি জমাতে হবে এনিয়ে ভাবছেন? মোট ১০টি দেশ সম্পর্কে আলোচনা করছি, যেখানে একজন একাউন্ট্যান্ট পাবেন তার সর্বোচ্চ স্বীকৃতি ও সম্মানি। তাই যদি সবেমাত্র কর্মজীবন শুরু করেন বা মাঝপথে এসে আটকে যান কিংবা যদি সফলতার দিকে একধাপ এগিয়ে থাকতে চান, তাহলে পছন্দ করে ফেলুন আপনার নতুন বাসস্থান।

১০. ইতালি

(পারিশ্রমিক আনুমানিক ২৭ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা, প্রতি বছরে)

আপনি যদি এই দেশে পাড়ি জমাতে চান, তাহলে আপনাকে ইতালির মাতৃভাষা আয়ত্ত্ব করতে হবে। শুধুমাত্র ইতালিই নয়, নিজের দেশ ব্যতিত অন্য যেকোনো দেশে স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করতে চাইলে সে দেশের ভাষা শিখে নেওয়া উচিত। এতে নিজের পেশায় বিশেষ সুবিধা লাভ করা যায় এবং আপনি খুব সহজেই সে দেশের মানুষের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারবেন।

ইতালিতে মোট তিনটি যোগ্যতা অনুসারে একাউন্টিং পেশাটিকে সাজানো হয়েছে। প্রথমটি হলো, একাউন্টিং বিশেষজ্ঞ (esperto contabile), দ্বিতীয়টি হলো , চাটার্ড একাউন্ট্যান্ট ( dottore commercialista) , লিগ্যাল অডিটর কিংবা আইনগত নিরীক্ষক ( revisore legale dei conti )। 

প্রত্যেকটি পোস্টেই নিয়োগ পেতে হলে প্রয়োজন অর্থনীতিতে তিন বছরের স্নাতক ডিগ্রি এবং তিন বছরের প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং পরীক্ষা। আর একজন চাটার্ড একাউন্ট্যান্ট হতে গেলে প্রয়োজন অর্থনীতিতে পাঁচ বছরের মাস্টার্স ডিগ্রি।

ছবিসূত্রঃ images2.alphacoders.com

৯. অস্ট্রেলিয়া

(পারিশ্রমিক আনুমানিক ২৮ লক্ষ টাকা, প্রতি বছরে )

আপনি যদি আপনার একাউন্টিং পেশা বেছে নিতে অস্ট্রেলিয়ায় যেতে চান, তবে আপনি সঠিক পথেই এগোচ্ছেন। ২০১৪ থেকে ২০১৯ এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় চাকরির সুযোগ পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্বের সেরা ন্যূনতম মজুরির দেশ হিসেবে এই দেশকে বিবেচনা করা হয়।

ছবিসূত্রঃ paperlief.com

মোট তিনটি পেশাজীবী সংগঠন দ্বারা অস্ট্রেলিয়ার একাউন্টিং ইন্ডাস্ট্রি নিয়ন্ত্রিত ও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। এই তিনটি সংগঠন হলো, সিপিএ অস্ট্রেলিয়া (CPA) , দ্য ইন্সটিটিউট অফ চাটার্ড একাউন্ট্যান্টস অফ অস্ট্রেলিয়া ( ICAA) এবং দ্য ইন্সটিটিউট অফ পাবলিক একাউন্ট্যান্টস ( IPA)। সিপিএ এবং আইসিএএ পদে নিয়োগ পাওয়ার জন্য প্রয়োজন  হিসাববিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি। কিন্তু আইপিএ পদের জন্য শুধুমাত্র হিসাববিজ্ঞানে একটি ডিপ্লোমা ডিগ্রিই যথেষ্ট।

৮. অস্ট্রিয়া

(পারিশ্রমিক আনুমানিক ২৬ লক্ষ ৬ হাজার টাকা প্রতি বছরে)

 একজন চাটার্ড একাউন্ট্যান্ট হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন পর্যাপ্ত শিক্ষা। এই শিক্ষা অর্জনের জন্য উপযুক্ত বিদ্যাপীঠ অস্ট্রিয়া। অস্ট্রিয়ায় পড়াশোনা শেষ করে এখানেই নিজের কর্মক্ষেত্র তৈরি করাও বুদ্ধিমানের কাজ। অর্থনীতি এবং আইন বিষয়ে পড়াশোনার জন্য সাধারণত অস্ট্রিয়াকে প্রথম সারির দেশগুলোর মাঝে স্থান দেওয়া হয়। পড়াশোনা শেষে অন্তত তিন বছর শিক্ষানবিশ হিসাবরক্ষক হিসেবে কাজ করতে হবে। অথবা সেভিংস ব্যাংক অডিটিং এসোসিয়েশন অনুমদিত অডিটিং অফিসে একজন এসিস্ট্যান্ট অডিটর কিংবা অডিটর হিসেবে কর্মদক্ষতা দেখাতে হবে।

ছবিসূত্রঃ wallpaperbetter.com

এছাড়া  পর্যাপ্ত শিক্ষা বা ডিগ্রি অর্জনের পর ট্যাক্স পরামর্শদাতা হিসেবে পেশাদারী পরীক্ষায় ( Professional Examination for Tax Consultants)  পাশ করতে হবে সে সাথে চাটার্ড একাউন্ট্যান্ট হিসেবে দুই বছরের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে। এ সকল ধাপে উত্তীর্ণ হওয়ার পরেই চাটার্ড একাউন্ট্যান্টদের পেশাদার পরীক্ষায় ( Professional Examination for Chartered Accountants) বসার সুযোগ লাভের জন্য দরখাস্ত করতে পারবেন । দ্য চেম্বার অফ চাটার্ড একাউন্ট্যান্টস পরবর্তীতে দরখাস্ত মঞ্জুর করে ভর্তির ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত দিবেন।

৭. জার্মানি

( পারিশ্রমিক আনুমানিক ২৯ লক্ষ ২৩ হাজার টাকা প্রতি বছরে)

একজন একাউন্ট্যান্ট হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে জার্মানিতে রয়েছে বিভিন্ন পথ। যদিও প্রথমত শিক্ষার্থীরা সর্বপ্রথম একজন ট্যাক্স এডভাইসার ( Steuerberater) হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করেন।  ট্যাক্স এডভাইজার নির্বাচনি পরীক্ষাকে ( Steuerberaterprüfung ) এই দেশের সবচেয়ে কঠিন ও মর্যাদাপূর্ণ পেশাদার পরীক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ছবিসূত্রঃ kinyu-z.net

এ পরীক্ষাটি দুই ভাগে বিভক্ত। ছয় ঘন্টার লিখিত ও একটি মৌখিক পরীক্ষা। এই পরীক্ষার পরে ছাত্রছাত্রীরা মূলত অডিটর (Wirtschaftsprüfer ) পদের নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহন করেন।মূল সাতটি পরীক্ষায় অংশগ্রহনের পূর্বে বেশ কিছু যোগ্যতা নির্ধারণী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয় ।

৬. ফিনল্যান্ড

( পারিশ্রমিক আনুমানিক ২৯ লক্ষ ৩৭ হাজার টাকা প্রতি বছরে)

ফিনল্যান্ডে মূলত দুইটি পথ রয়েছে একাউন্ট্যান্ট হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে আসা ছাত্রের জন্য। সেন্ট্রাল চেম্বার অফ কমার্স অনুমোদিত কেএইচটি অডিটর হিসেবে  এবং আঞ্চলিক চেম্বার অফ কমার্স অনুমোদিত এইচটিএম অডিটর হিসেবে ।  কেএইচটি অডিটর পদে নিয়োগ পেতে প্রয়োজন অর্থনীতি ,আইনে অথবা সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে মাস্টার্স ডিগ্রি। সেই সাথে সর্বনিম্ন তিন বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকতে হবে  এবং  উত্তীর্ণ হতে হবে কেএইচটির পেশাদার পরীক্ষায়।

ছবিসূত্রঃ whitecase.com

অন্যদিকে এইচটিএম অডিটর হওয়ার জন্য ব্যাপারগুলো একটু সহজ। একজন এইচটিএম অডিটরের জন্য প্রয়োজন হবে যেকোনো মানের বিশ্ববিদ্যালয় অথবা কোনো পলিটেকনিক হতে প্রাপ্ত ডিগ্রি , তিন বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং এইচটিএম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া।

৫. যুক্তরাজ্য

( পারিশ্রমিক আনুমানিক ৩৫ লক্ষ ৩২ হাজার টাকা প্রতি বছরে )

যুক্তরাজ্যে একাউন্ট্যান্টদের বেশ মূল্যায়ন দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে যুক্তরাজ্যের একজন একাউন্ট্যান্ট যেকোনো দেশে প্রতি বছরে কোটি টাকাও পারিশ্রমিক পেতে পারেন । যুক্তরাজ্যে একজন একাউন্ট্যান্ট হিসেবে কাজ শুরু করতে হলে এসোসিয়েশন অফ চাটার্ড সার্টিফাইড একাউন্ট্যান্টস  (ACCA), দ্য ইন্সটিটিউট অফ চাটার্ড একাউন্ট্যান্টস ইন ইংল্যান্ড (ICAEW), দ্যএসোসিয়েশন অফ ইন্টারন্যাশনাল একাউন্ট্যান্টস  (AIA) অথবা দ্য চাটার্ড ইন্সটিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট  (CIMA) এর যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।

ছবিসূত্রঃ londontopia.net

প্রত্যেকটির পেশাদার পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য গণিত ও ইংরেজী অন্তর্ভুক্ত অন্তত দুটি ‘এ’ লেভেল এবং তিনটি জিসিএসইর (GCSE) প্রয়োজন হবে। এছাড়া আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতায় যদি অর্থনীতি কিংবা হিসাববিজ্ঞান অন্তর্ভুক্ত থাকে, তাহলে আপনার নিয়োগ আরো সহজতর হবে।

৪. যুক্তরাষ্ট্র

( পারিশ্রমিক আনুমানিক ৩৪ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা প্রতি বছরে )

যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি হিসাব মতে, ২০১৪ হতে ২০২৪ এর মধ্যে একাউন্ট্যান্ট ও অডিটরের চাকুরিক্ষেত্রে ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। প্রায় ১ লক্ষ ৪২ হাজার পোস্ট ইতিমধ্যে তৈরি করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ একাউন্ট্যান্ট পদের জন্য হিসাববিজ্ঞানে স্নাতক কিংবা সমতুল্য ডিগ্রি চাওয়া হয়।

ছবিসূত্রঃ wallpapers.ae

কিন্তু অধিকাংশ পদপ্রার্থী মাস্টার্স ডিগ্রী নিয়েও আবেদন করে থাকেন। চার ভাগে বিভক্ত ন্যাশনাল এক্সামে উত্তীর্ণদের সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনের ( SEC ) রিপোর্ট সংগ্রহ করতে হবে।

৩. দক্ষিণ কোরিয়া

( পারিশ্রমিক আনুমানিক ৩৬ লক্ষ ৩৮ হাজার টাকা প্রতি বছরে )

দক্ষিণ কোরিয়া এশিয়ার একমাত্র দেশ, যার অবস্থান  সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকদাতা দেশের মধ্যে রয়েছে।  সরকারি একাউন্ট্যান্ট হিসেবে নিজের স্থান পাকা করতে হলে প্রথমে ফিনানশিয়াল সার্ভিস কমিশন হতে লেভেল ১ ও লেভেল ২ এ দুটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

ছবিসূত্রঃ akp.ma

এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হলে হিসাববিজ্ঞানে ২৪ ক্রেডিট অথবা ১২ ক্রেডিট , ব্যবসাশিক্ষায় ৯ ক্রেডিট  এবং অর্থনীতিতে ৩ ক্রেডিট  প্রয়োজন হবে। এই পরীক্ষা শেষে এবং কাঙ্ক্ষিত ফলাফল লাভ করার পরেই পাওয়া যাবে সিপিএ (CPA)  সার্টিফিকেট। ১ বছর অভিজ্ঞতা অর্জন অথবা  কোরিয়ান ইন্সটিটিউট অফ সার্টিফাইট পাবলিক একাউন্ট্যান্টস দ্বারা পরিচালিত ১০০ ঘন্টা ট্রেনিং নেওয়া শেষে একাউন্ট্যান্ট হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ায় কাজ করার সুযোগ পাওয়া যায়।

২. ব্রাজিল

(পারিশ্রমিক আনুমানিক ৩৭ লক্ষ ৯৮ হাজার টাকা প্রতি বছরে )

ব্রাজিলে  অন্তত পাঁচ লক্ষ একাউন্ট্যান্ট পদ রয়েছে,  যার ১ লক্ষ ৪০ হাজার  সাওপাওলোতেই (São Paulo) ।  ব্রাজিলে পাড়ি জমানোর আগে কিছু তথ্য জেনে রাখা প্রয়োজন ।

ছবিসূত্রঃ wallpaperstudio10.com

বিদেশী একাউন্ট্যান্টদের জন্য ব্রাজিলে কিছুটা ভিন্ন নিয়ম প্রচলিত।  আর কনসেলো ফেদারেল দে কন্তাবিলিদাদেতে  (CFC)  নিবন্ধনের মাধ্যমে তিন বছরের জন্য পরামর্শদাতা হিসেবে চাকরির সুযোগ পাওয়া যাবে।

১. পেরু

( পারিশ্রমিক আনুমানিক ৩৮ লক্ষ ৭২ হাজার টাকা প্রতি বছরে )

পেরুকে একাউন্ট্যান্ট পদে বিশ্বের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকদাতা দেশ হিসেবে মানা হয়। পেরুতে একজন একাউন্ট্যান্টের জন্য ডিপ্লোমা ডিগ্রি হলো সর্বনিম্ন যোগ্যতা। পরবর্তীতে আঞ্চলিক একাউন্টিং সংস্থার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে।  এছাড়া বিদেশি একাউন্ট্যান্টদের জন্য পেরুতে সাময়িকভাবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।

ছবিসূত্রঃ ppp-news.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *