শ্রেণীপাঠে অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানেই নিজের অভিজ্ঞতা, আত্মবিশ্বাস ও জ্ঞানের পরিধি আরও বাড়ানো। আর প্রতিদিনের শ্রেণীপাঠে অংশগ্রহণের মাধ্যমেই ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের মেধা ও দক্ষতা আরও উন্নত করতে পারে।

ছবিসূত্রঃ worldbank.org

কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর অনেক ছাত্রছাত্রীর প্রতিদিনের শ্রেণীপাঠে যোগ দেবার ইচ্ছা কমে যায়। এর একটি কারণ হলো, বর্তমানে শ্রেণীপাঠ সংক্রান্ত প্রায় সব বিষয়ের উপর টিউটোরিয়াল ইন্টারনেটে পাওয়া যায়। তাই অনেক ছাত্রছাত্রীরা শ্রেণীপাঠে অংশগ্রহণকে ততটা গুরুত্ব দেয়না।

কিন্তু শ্রেণীপাঠে অংশগ্রহণ করার উদ্দেশ্য কেবল নির্ধারিত বই থেকে পরীক্ষায় কী আসবে না আসবে, সেটা জানা নয়। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিটি ছাত্রকে কেবল পুঁথিগত জ্ঞান দেয় তা নয়, বরং এর পরবর্তীতে কর্মজীবনে যোগদানের জন্যও তাদেরকে উপযুক্ত করে তোলে। এখানে শ্রেণীপাঠে অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা ও উপকারিতা নিয়ে আলোচনা করা হলো।

১. শ্রেণীপাঠে যোগদানের মাধ্যমে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বাড়ে

নিয়মিত শ্রেণীপাঠে যোগ দেয়ার মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীরা প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন শেষ করার আগ্রহ পায়। শ্রেণীপাঠে অনিয়মিত হলে ধীরে ধীরে পড়াশোনা করার আগ্রহ কমে যায়। ফলে অন্যান্য দিকে আসক্ত হবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাছাড়া কোনো অংশ বুঝতে সমস্যা হলে সরাসরি শিক্ষকের কাছ থেকে তা বুঝে নেয়ার সুযোগ থাকে।

২. শ্রেণীপাঠে যোগ দিলে শিক্ষকরা ছাত্রদের অগ্রগতি বুঝতে পারেন

ছবিসূত্রঃ Orthochristian.com

শিক্ষকরা তাদের বিষয় শ্রেণীতে বোঝানোর সময় মাঝে মাঝে ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্ন করে থাকেন। এর মাধ্যমে তারা বুঝতে পারেন, ছাত্রদের অগ্রগতি কতটুকু। কিংবা তারা বিষয়টি সম্পর্কে কতটুকু বুঝতে পেরেছে, সেটাও শিক্ষক আন্দাজ করতে পারেন। কিন্তু ছাত্ররা যদি ক্লাসে অংশই না নেয় তবে তা বোঝা সম্ভব হবে না এবং ছাত্ররাও পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়বে।

৩. শ্রেণীপাঠে যোগ দানের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের পড়া ভালোভাবে বুঝে নিতে পারে

ক্লাসে শিক্ষকরা নির্দিষ্ট বিষয়ের পাশাপাশি সে বিষয় নিয়ে নানা উদাহরণ দিয়ে থাকেন। ফলে বিষয়টি ছাত্রদের পক্ষে বোঝা সহজ হয়। তাছাড়া শিক্ষকদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে ছাত্ররাও নিজেদের জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে পারে এবং যে কোনো বিষয়ে তাদের ধারণা আরো পরিষ্কার হয়।

৪. পরবর্তী শ্রেণীপাঠের জন্য প্রস্তুতি নেয়া সহজ হয়

ক্লাসে অনেক সময় শিক্ষকরা আগে কী পড়ানো হয়েছিল এবং পরবর্তীতে কী পড়ানো হবে, সে সম্পর্কে আলোচনা করে থাকেন। এতে পরবর্তী ক্লাসের জন্যও ছাত্ররা প্রস্তুতি নিতে পারে।

৫. ছাত্রদের অমনোযোগিতা দূর হয়

যেসব ছাত্ররা নিয়মিত শ্রেণীপাঠে যোগ দেয় না, পড়াশোনার প্রতি তাদের মনোযোগ ধীরে ধীরে কমতে থাকে।  পরবর্তীতে তারা অযাচিত কাজেও জড়িয়ে পড়তে পারে।  তাই প্রত্যেক ছাত্রেরই নিয়মিত শ্রেণীপাঠে অংশ নেয়া উচিত।

৬. শ্রেণীপাঠে অংশগ্রহণকারী ছাত্রদের মানসিক অবস্থা বোঝা যায়

কোনো ছাত্র যদি ক্লাস চলাকালীন সময়ে অমনোযোগী থাকে, তবে শিক্ষকদের পক্ষে তা ধরা সহজ হয়। ফলে যদি সে পারিবারিক বা অন্য কোনো কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকে, তখন শিক্ষকরাও তাকে সে অবস্থায় সাহায্য করতে পারেন।

আবার অনেক সময় অকারণেই ছাত্রছাত্রীরা ক্লাসে শিক্ষকের কথা না শুনে অন্য কাজে ব্যস্ত থাকে। এমন হলে শিক্ষকের পক্ষেও তাদের ধরা এবং তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া সহজ হয়।

কী করে ছাত্রছাত্রীদের শ্রেণীপাঠে যোগদানে আগ্রহী করা যায়?

ছাত্রছাত্রীদের নিজে থেকেই শ্রেণীপাঠের প্রতি আগ্রহী হতে হবে। আর শ্রেণীপাঠে অংশগ্রহণ বলতে বোঝায় একজন ছাত্র মনোযোগ দিয়ে শিক্ষকের কথা শুনবে, তার প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করবে এবং নিজের কোনো দ্বিধা বা মতামত থাকলে সে ব্যাপারে শিক্ষককে জিজ্ঞেস করবে। আর ছাত্ররা যেন নিয়মিত শ্রেণীপাঠে যোগ দেবার আগ্রহ পায়, সেজন্য শিক্ষকেরও কিছু করণীয় আছে।

যেহেতু অভিজ্ঞতা আর ভুল করা থেকেই মানুষ অনেক কিছু শিখতে পারে, তাই শিক্ষকদেরও পড়ার বিষয়টিকে যথাসম্ভব বাস্তবমুখী করে ছাত্রদের সামনে উপস্থাপন করতে হবে। ছাত্রদের সাথে সবসময় আন্তরিকতাপূর্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, যেন ছাত্ররাও তাদের চিন্তা, ইচ্ছা, মতামত সবকিছু নিয়ে শিক্ষকের সাথে আলোচনা করতে পারে। এভাবেই শ্রেণীপাঠে ছাত্ররা যোগদান করতে আগ্রহ পাবে। কীভাবে ছাত্রদের শ্রেণীপাঠে মনোযোগী করা যায়, তার কিছু উপায় এখানে আলোচিত হলো।

১. বিভিন্ন বাস্তবমুখী কাজে ছাত্রদের ব্যস্ত রাখা

ছবিসূত্রঃ pactosolucoes.com.br 

বর্তমানে ছাত্রদের শ্রেণীপাঠে মনোযোগী করার জন্য বিভিন্ন বিষয়ের উপর তাদের প্রেজেন্টেশন তৈরি করতে দেয়া হচ্ছে।  এছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ে এসাইনমেন্ট, প্রজেক্ট ইত্যাদি জমা দেয়া, বিভিন্ন ওয়ার্কশপ ও ট্রেনিংয়ে অংশগ্রহণ করানোও ছাত্রদেরকে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী করার ভালো ও কার্যকরী উপায়।

২. ছাত্র-শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের নিজেদের মধ্যে আলাপআলোচনার ব্যবস্থা করা

ছবিসূত্রঃ CMBA Ontario

যে কোনো ক্লাসে যে কেবল শিক্ষক লেকচার দেবেন, আর ছাত্ররা তা শুনবে আর প্রশ্ন করবে, এরকম ভাবা ঠিক নয়। বরং ছাত্রদের বিভিন্ন দলে ভাগ করে বিভিন্ন বিষয়ের উপর তাদের আলাপআলোচনা করতে বলা যেতে পারে।  এতে বিনোদনের মাধ্যমে ছাত্ররা অনেক কিছু শিখতে আগ্রহ পাবে পাশাপাশি শ্রেণীপাঠেও মনোযোগী হবে।

৩. শিক্ষাসফরের আয়োজন করা

ছবিসূত্রঃ Flickr

বদ্ধ দেয়ালের মধ্যে পাঠ সবসময় আনন্দকর নাও হতে পারে। তাই ছাত্রদের পাঠের সাথে সম্পর্কিত কোনো জায়গায় মাঝে মাঝে শিক্ষাসফরের আয়োজন করা যেতে পারে। তবে সেখানে গিয়ে ছাত্ররা কিছু শিখলো কিনা তা জানার জন্যও ছাত্রদের সে সম্পর্কে এসাইনমেন্ট বা বক্তব্য দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

এভাবেই আমরা ছাত্রসমাজকে নিয়মিত শ্রেণীপাঠে যোগদানে আগ্রহী করতে পারি। এতে তারা অনর্থক অন্যান্য অযাচিত কাজের প্রতি আগ্রহী হবে না।

Featured Image: APM Reports

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *